একদা সমাজে সর্বহারাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার মহৎ স্বপ্ন, আদর্শ নিয়ে জনতার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জনতার সঙ্গে মিশে, মন বুঝে তবেই রাজনৈতিক লড়াই করা যায়, এই বিশ্বাস ছিল অটুট। শোষিত শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে এসে বৃহত্তর বাম ঐক্যের শরিক। কিন্তু পরবর্তীকালে আদর্শগত মতপার্থক্য হওয়া মাত্রই 'বড়'দের সেই ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে 'একলা চলো'র পথ ধরতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নয়। এভাবেই বরাবর একরোখা, আপসহীন, 'রাফ অ্যান্ড টাফ' এক ব্যক্তি হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক সোশালিজমের প্রতিষ্ঠাতা সমীর পুততুণ্ড (Samir Putatundu)। নিজের আদর্শ নিয়ে রাজনীতির পথে এগিয়ে চললেও শেষ পর্যন্ত বড় আক্ষেপ ছিল সদ্যপ্রয়াত পিডিএস সদস্যের। সে আক্ষেপ হল, সিপিএম নিজেদের ভুলগুলি শুধরে ভুলের রাস্তা আরও চওড়া করেছে।
নিজের আদর্শ নিয়ে রাজনীতির পথে এগিয়ে চললেও শেষ পর্যন্ত বড় আক্ষেপ ছিল সদ্যপ্রয়াত পিডিএস সদস্যের। সে আক্ষেপ হল, সিপিএম নিজেদের ভুলগুলি শুধরে ভুলের রাস্তা আরও চওড়া করেছে।
আটের দশকের কিছু আগে থেকে সমীর পুততুণ্ডের (Samir Putatundu) রাজনৈতিক জীবন শুরু। জনতার কাজের জন্য সিপিএমের হাত ধরেই তা শুরু করেছিলেন। কাস্তে-হাতুড়ি-তারায় ভর করে জনসংযোগ থেকে সংগ্রাম, প্রাণঢালা কাজ করেছেন। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দাপুটে নেতার ভূমিকায় সমীর পুততুণ্ডকে দেখেছিলেন সকলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বামফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শরিক সিপিএমের সঙ্গে মতানৈক্য শুরু হয় তাঁর।
সিপিএম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পিডিএস প্রতিষ্ঠা করেন সমীর পুুততুণ্ড। ফাইল ছবি
সূত্রপাত ২০০১ সাল থেকে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রিত্ব খারিজ করে দল। এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি সমীরবাবুরা। তৎক্ষণাৎ সিপিএম ছেড়ে পিডিএস অর্থাৎ পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক সোশালিজম প্রতিষ্ঠা করেন। সঙ্গী ছিলেন আরেক 'বিক্ষুব্ধ' সিপিএম নেতা সইফুদ্দিন চৌধুরী। তিনিও সিপিএমের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। কিন্তু মতানৈক্যের কারণে সিপিএমের হাত ছেড়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি সইফুদ্দিন, সমীরবাবুরা। এক সাক্ষাৎকারে সমীরবাবু বলেছিলেন, বাম আদর্শ অনেক বড়। তার বাস্তবায়নে কোনও ফাঁকি চলে না, নিঃসন্দেহে কঠিন পথ। কিন্তু বামেদের বড় শরিক সিপিএম নীতি, আদর্শ থেকে সরে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা একজন খাঁটি বামপন্থী হয়ে মেনে নেওয়া কঠিন।
২০০৬-০৭ সালে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের তীব্র বিরোধিতা করতে দেখা গিয়েছিল পিডিএসকে। যে কৃষি আন্দোলনে জমির সম বিলিবণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বামপন্থীরা, সেখান থেকে সরে টাটাদের মতো শিল্পপতিদের পক্ষ নিয়ে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা তৈরির জন্য কৃষকের জমির জবরদখল কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলেই মনে করছিলেন তাঁরা। আর তাই নিজেরা শামিল হয়েছিলেন জমি রক্ষা আন্দোলনে। এখানেই তাঁদের পথ মিলে গিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আর তাই বোধহয় নীতিগত ফারাক থাকলেও তৈরি হয়েছিল সুসম্পর্কও।
২০০৬-০৭ সালে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের তীব্র বিরোধিতা করতে দেখা গিয়েছিল পিডিএসকে। যে কৃষি আন্দোলনে জমির সম বিলিবণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বামপন্থীরা, সেখান থেকে সরে টাটাদের মতো শিল্পপতিদের পক্ষ নিয়ে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা তৈরির জন্য কৃষকের জমির জবরদখল কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলেই মনে করছিলেন তাঁরা।
পরবর্তীকালে রাজ্যে তৃণমূলের বিরোধিতা করতে গিয়ে সিপিএম নিজেদের প্রচারে বড়সড় ভুল করেছিল বলেই মনে করতেন সমীর পুততুণ্ড (Samir Putatundu)। তাঁর মতে, তৃণমূল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অজ্ঞানতাবশত বিজেপির জন্য রাস্তা প্রশস্ত করেছিল সিপিএম। সরকার থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিপিএমের ঝুলিতে ত্রুটির পর ত্রুটি জমা হয়েছে বলে মনে করেন সমীরবাবু। ঠিকমতো শত্রু চিহ্নিত করতে না পারা, জনতার কাছে সঠিক ইস্যু উপস্থাপিত না করতে পারা এবং ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্নতার জেরে সিপিএম আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারল না বলে মনে করতেন তিনি।
জনতাকে সঙ্গে নিয়েই বরাবর রাজনীতি করেছেন সমীর পুততুণ্ড। ফাইল ছবি
সিপিএম-পিডিএসের এই দ্বন্দ্বের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছিল ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিপিএমের 'সংযুক্ত মোর্চা' গঠন। সমীরবাবু এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ ও তীব্র আপত্তির সুরে জানিয়েছিলেন, আনকোরা, সাম্প্রদায়িক দল আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করে সংযুক্ত মোর্চার গঠন সিপিএমের আরেক 'ঐতিহাসিক ভুল' তো বটেই, জনসমর্থন টানার বদলে তা থেকে দূরে সরে যাওয়ার এক বড় পদক্ষেপ।তিনি মনে করেন, এতে দলের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়েছিল।
সিপিএম-পিডিএসের এই দ্বন্দ্বের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছিল ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিপিএমের 'সংযুক্ত মোর্চা' গঠন।
সিপিএমের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবে নতুন মুখ তুলে আনা নিয়ে সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল। সমীরবাবুর কথায়, ''প্রচারের জন্য সস্তার গান বেঁধে যুবদের ভোট টানা যায় না। তাঁদের দিতে হবে বিকল্প পথের সন্ধান ও যথাযথ আশ্বাস, যা বাস্তবায়িত করতে সক্ষম থাকতে হবে দলের নেতাদের। কিন্তু যত দিন গিয়েছে, সিপিএম নিজেদের নীতি, আদর্শ থেকে সরে এসে বস্তাপচা ধ্যানধারণা আঁকড়ে থেকেছে। তাই আজ তারা ব্যর্থ।'' জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এসব আক্ষেপ ছিল সমীর পুততুণ্ডের।
