ধান থেকে আলু। সরষে কিংবা বাদাম। শিল্পের নামে বেহাত হয়ে যাওয়া সিঙ্গুরের সেই জমিতেই আবার ফলছে সোনা। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কথা বলে একসময় বাঁকা নজরে কম পড়েননি সুশান্ত বাগুই, সুশীল সামন্তরা। কিন্তু তখন কে শোনে কার কথা! জমি নিয়ে নিয়েছিল বাম সরকার। কিন্তু শিল্প শেষমেশ মাথা তুলে দাঁড়ায়নি এ তল্লাটে। কৃষিজমি ফেরানোর আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক পালাবদল। কথা রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময়ের বেহাত জমি ফিরে পেয়েছেন সুশান্ত, সুশীল, বিকাশরা। তামাম অপপ্রচার হেলায় দূরে ঠেলে সিঙ্গুরের সেই জমিতেই এখন দেদার ফসল ফলাচ্ছেন একসময় 'অনিচ্ছুক চাষি' তকমায় কোণঠাসা হয়ে পড়া সেই তাঁরাই। হাত বাড়ালেই সেচের বিপুল উদ্যোগ। পাশে আছেন 'কৃষকবন্ধুরা'। শিল্পের সঙ্গে বৈরিতা না রেখেও মাঠকে মাঠ সোনার ফসলে ভরিয়ে কৃষির বিজয়কেতন উড়িয়ে চলেছেন সুশান্ত, সুশীলদের মতো চাষিভাইয়েরা।
এখন সিঙ্গুরের পালনগর, খাসেরভেড়ি, বেরাবেড়ি, বাজেমেলিয়া, সিংহেরভেড়ি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্রমশ বেড়েই চলেছে কৃষিজমির পরিধি। আর ফেরত পাওয়া সমস্ত জমিতেই এখন ফলছে ধান, সরষে, আলু, বাদাম-সহ সমস্ত রকম শস্য। চাষ করে হাসি ফুটেছে সিঙ্গুরের চাষিদের মুখে। যে কিছুটা জমি এখনও চাষযোগ্য হয়নি, সেই সব জমিও চাষযোগ্য করে তোলার কাজ চলছে জোরকদমে। সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানার নামে রাজ্যের তৎকালীন বাম সরকার কার্যত জোর করেই দেদার কৃষিজমি অধিগ্রহণ করেছিল। রুখে দাঁড়িয়ে সেই জমি ফেরতের দাবিতে পালটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 'ইচ্ছুক' আর 'অনিচ্ছুক' দুভাগে ভাগ করে চাষিদের নিয়ে ছিনিমিনি কম খেলেনি বাম সরকার। কিন্তু শেষমেশ তৃণমূল নেত্রীর লাগাতার লড়াইয়েরই জয় হয়। পালাবদল ঘটে রাজ্যে। বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই সিঙ্গুরের অধিগৃহীত জমি চাষিদের ফেরানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন তিনি। চাষিরা জমি ফেরত পাওয়ার পর ২০১৬ সালের অক্টোবরে গোপালনগর এলাকায় কৃষিজমিতে নিজে হাতে সরষে বীজ ছড়িয়ে চাষের সূচনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর কয়েকমাস পর থেকেই হলুদ সরষেফুলে ছেয়ে যায় বিঘার পর বিঘা জমি। আর পিছনে ফিরে তাকায়নি সিঙ্গুর। সুশীল, প্রীতম, বিকাশদের পরিশ্রমে সেই মাটিতেই ফসলের পরিমাণ বেড়েছে দিনকে দিন। হাসি আরও চওড়া হয়েছে ওঁদের মুখে।
সিঙ্গুরের জমিতে সরষের বীজ ছড়াচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
স্থানীয় চাষি সুশান্ত বাগুই বলছিলেন, "প্রথম থেকেই দিদি বলেছিলেন আমরা আমাদের চাষের জমি ফেরত পাব। এখন দেখুন, জমি তো পেয়েছিই, আবার আমরা সোনার ফসল ফলাচ্ছি। যে মরশুমে যে ফসল হয়, সেই সব ফসলই ফলছে যথারীতি। সমস্ত জমিতেই আমরা চাষ করছি। এতেই আমাদের সংসার চলছে।” একই কথা স্থানীয় কৃষক সুশীল সামন্ত, সুশান্ত ঘোষ, প্রীতম ঘোষ কিংবা স্থানীয় বাসিন্দা বিকাশ ঘোষের মুখে। কোন ফসলে কতটা লাভের মুখ দেখেছেন থেকে শুরু করে, আগামীর পরিকল্পনা সব নিয়েই ওঁরা অকপট। ওঁদের কথায়, "মাঝেমধ্যেই আমরা কিছু জায়গায় দেখি যে অনেকে বলছে সিঙ্গুরের জমিতে নাকি এখন আর চাষ হয় না। কিন্তু তাঁরা কেন মিথ্যা বলেন বুঝি না। আপনারা তো নিজেরাই এসে দেখছেন চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।" সিঙ্গুরে কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন, এখন সেই সিঙ্গুরেরই বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্না বলেন, "সিঙ্গুরের অধিগ্রহণ করা জমির আশি শতাংশতেই এখন চাষ হচ্ছে। ২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রী চাষের সূচনা করার পর থেকেই ধাপে ধাপে। মোট জমির ১৫ শতাংশ কারখানা সংলগ্ন। সেই সব জমির মালিক কারখানা কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে কারখানা সম্প্রসারণের জন্য জমি কিনে রেখেছিল কিছু সংস্থা।
সেখানে চাষ করার মানসিকতা তাদের নেই। তবুও চাষের কাজে সেই জমি ব্যবহারের জন্য তাদের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া পাঁচ শতাংশ যে জমি বাকি থাকছে সেটাও চাষযোগ্য করে তোলার কাজ জোরকদমে চলছে। বাকি সমস্ত জমিতেই ধান, আলু, সরষে, বাদাম, তিল-সহ বিভিন্ন সবজি চাষ হচ্ছে।” জমি রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পলাশ ঘোষ বলেন, "এখন সিঙ্গুরের অধিগ্রহণ হওয়া প্রায় আশি শতাংশের বেশি জমিতে চাষিরা চাষ করে ফসল ফলাচ্ছে। বিরোধীরা ভোট এলেই সিঙ্গুর নিয়ে কুৎসা শুরু করে কিন্তু আপনি দেখবেন প্রত্যেক ভোটেই সিঙ্গুর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সব থেকে বেশি ভোট পায় আর আগামী দিনেও পাবে। যেটা হচ্ছে, তা হল জাতীয় সড়কের পাশে অনুসারী শিল্পের জন্য বিভিন্ন সংস্থার কিনে রাখা জমিতে চাষ হয় না। সেটা দেখিয়েই বিরোধীরা মিডিয়ার মাধ্যমে সহজে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে।" ইতিমধ্যেই অধিগ্রহণ করা জমিতে চাষের সুবিধার জন্য ৬১টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। পাশাপাশি বর্ষার জল সেচের কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি বড় সেচখাল তৈরির কাজও চলছে। সেই জলও চাষের জমিতে ব্যবহার করা যাবে। সিঙ্গুর ব্লকে ইতিমধ্যে চল্লিশ হাজার চাষি কৃষকবন্ধু প্রকল্পের সুবিধাও পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে কৃষিকে ভিত্তি করেই আরও এগিয়ে চলার পথ দেখাচ্ছে সিঙ্গুর।
