অর্ণব আইচ, কলকাতা: বাজারে গিয়েই কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল বেহালার ব্যবসায়ীর। পাড়ার দুই ভদ্রলোক যেন তাঁকে নিয়েই কিছু বলছেন। এক দোকানদারের চাউনিও ছিল অন্যরকমের। তিনি যেন মস্ত একটা অপরাধ করে ফেলেছেন। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দুই ছাত্র পড়তে যাচ্ছিল। তাঁর কানে এল, একজন আরেকজনকে বলছে, “দ্যাখ, দ্যাখ, এই লোকটাই না?”
তখনও কিছু বুঝতে পারেননি ওই ব্যবসায়ী। বুঝতে পারলেন মোবাইলের নেট অন করে। পোস্টটি দেখতে পেলেন তিনি। পোস্টে লেখা রয়েছে, এক চিকিৎসক তাঁর বৃদ্ধা মাকে রেখে দিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। গত ১১ এপ্রিল তিনি মায়ের শরীর খারাপ শুনে মাকে দেখতে আসেন। চিকিৎসক হিসাবে তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর মায়ের আয়ু আর বেশিদিন নেই। তাঁর মা বৃদ্ধাশ্রমে মারা যান। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরও তিনি শেষকৃত্য করতে আসেননি। উল্টে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকে চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাঁরাই যেন মায়ের দেহ দাহ করেন। পোস্টে চিকিৎসকের নামও দেওয়া রয়েছে। আর পোস্টের নিচে রয়েছে ওই বৃদ্ধার দেহ আর তার সঙ্গে বৃদ্ধার ‘চিকিৎসক ছেলে’র ছবি৷
[ভাগাড়ের মাংস ডেকে আনতে পারে মৃত্যু! হতে পারে মৃগী, পক্ষাঘাতও]
চমকে ওঠেন ওই ব্যবসায়ী। ছবিটি যে তাঁরই। এই ছবিটি তিনিই পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু তিনি চিকিৎসকও নন। বৃদ্ধার মৃত্যুর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক তাঁর নেই। যদিও ওই চিকিৎসক ও তাঁর একই নাম। ততক্ষণে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে পোস্টটি। ফেসবুক থেকে হোয়াটস অ্যাপে ছড়িয়ে পড়েছে এই পোস্ট৷ রাস্তাঘাটে বেরনো মুশকিল হয়ে গিয়েছে ওই ব্যবসায়ীর৷
“তোর বাবা এরকম?” সহপাঠীদের কাছ থেকে এই প্রশ্ন শুনতে হয়েছে তাঁর মেয়েকেও। শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছেই যান ব্যবসায়ী। লালবাজারের সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। গোয়েন্দারা এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন৷ জানা গিয়েছে, এই বিষয়ে পরপর দু’টি অভিযোগ দায়ের করা হয়। প্রথমে ১৫ এপ্রিল তিনি অভিযোগ দায়ের করেন। এর পর ১৮ এপ্রিল তিনি কয়েকজনের বিরুদ্ধে লালবাজারে অভিযোগ জানান।
ওই ব্যবসায়ী অভিযোগে জানিয়েছেন, ওই পোস্টটি করার পর এক ব্যক্তি ফেসবুক থেকে তাঁর ছবি ডাউনলোড করে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, তিনিই ওই চিকিৎসক ও তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে কোন্নগরের বৃদ্ধাশ্রমে৷ ফেসবুকে এই পোস্ট ৯০০-র উপর শেয়ার হয়৷ বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা হয়। এমনকী, তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও মেসেনজারে অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেন। এতে তাঁর উপর মানসিক চাপ পড়ে। তিনি প্রথমে বিষয়টি ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে জানান। তার পরও আসতে শুরু করে মন্তব্য। তাঁর ছবি দেখিয়ে কয়েকজন বলে, ‘একে চিনে নিন।’ যথেষ্ট অপমানজনক একের পর এক মন্তব্যের জেরে শেষ পর্যন্ত তিনি লালবাজারে অভিযোগ দায়ের করেন।
[নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন, গ্রেপ্তার সৎ বাবা]
এই বিষয়ে ওই ব্যবসায়ীর প্রাথমিক অভিযোগ এক মহিলার বিরুদ্ধে, যিনি প্রথম ওই পোস্টটি করেন। ব্যবসায়ী জানান, তিনি ওই মহিলার ফোন নম্বর জোগাড় করে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এ-ও অনুরোধ করেন, তাঁর ছবির বদলে আসল চিকিৎসকের ছবি দিতে। কিন্তু তাতে রাজি হননি মহিলা। এর পর ওই ব্যবসায়ীর সন্দেহ, আদৌ কোনও ঘটনা ঘটেছে কি না। তিনি জানান, তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে গত বছরের ২৭ মার্চ। এই শোক কাটিয়ে উঠতে তাঁর বেশ কয়েক মাস সময় লাগে। ওই কয়েকমাস তিনি ভালভাবে কোনও কাজও করতে পারেননি। তার উপর এই ধরনের অপমানের ফলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ঘটনাচক্রে পোস্টটিতে বৃদ্ধার যে নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি তাঁর মাসির নাম। পোস্টের মন্তব্যের কয়েকজন ওই চিকিৎসককে সামাজিকভাবে বয়কট করার ডাক দিয়েছেন। কিন্তু শুধু এক নাম ও ছবির কারণে তাঁর উপর চাপ পড়ছে৷ এই পোস্ট তৈরি ও ছড়ানোর পিছনে যারা রয়েছে, তাদের জেরা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
The post ভুয়ো ফেসবুক পোস্টের জের, কটূক্তির শিকার হয়ে লালবাজারের দ্বারস্থ ব্যবসায়ী appeared first on Sangbad Pratidin.
