কয়েক মাস আগেও মহম্মদবাজার ব্লকের দেউচা-পাঁচামি প্রস্তাবিত কয়লা ব্লকের প্রবেশমুখে পৌঁছালেই চোখে পড়ত বিশাল এক তোরণ। জ্বলজ্বল করত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। বড় বড় অক্ষরে সেখানে লেখা ছিল, 'বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লা ব্লকে আপনাকে স্বাগত।' পাশেই আরও একটি বিশাল ব্যানারে তাঁর ছবির সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছিল- 'উন্নয়নের ফুল ফুটল, সব অন্ধকার ঘুচল।'
আজ সেই জায়গায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। তোরণটি এখনও রয়েছে, কিন্তু নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। নেই উন্নয়নের ঝলমলে বার্তা। নেই পিডিসিএলের সেই বিশাল প্রচার ব্যানারও। যেন রাতারাতি মুছে ফেলা হয়েছে এক সময়ের বহুল প্রচারিত রাজনৈতিক স্বপ্নের দৃশ্যপট।
দেউচা-পাঁচামি প্রকল্পকে একসময় রাজ্য সরকারের 'ড্রিম প্রজেক্ট' বলা হত। দাবি করা হয়েছিল, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লা ভাণ্ডারকে ঘিরে গড়ে উঠবে শিল্পের নতুন দিগন্ত। তৈরি হবে কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান। বীরভূমের অর্থনীতি বদলে যাবে, উন্নয়নের নতুন সূর্য উঠবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নের উজ্জ্বল রং যেন মুছে যেতে শুরু করে।
প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত বাস্তবে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়নি। বরং এলাকায় মূলত পাথর উত্তোলনের কাজই হয়েছে। নতুন করে পাথর উত্তোলনের জন্য একাধিকবার গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হলেও কোনও সংস্থা আগ্রহ দেখায়নি বলে খবর। সিউড়ির বিজেপি বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, "যেখানে কয়লা ৮০০ মিটার থেকে ২ কিলোমিটার গভীরে রয়েছে, সেখানে বিপুল পাথরের স্তর সরিয়ে কয়লা তুলতে প্রচুর সময় ও অর্থ লাগবে। যে মানের কয়লা রয়েছে, তা অর্থনৈতিকভাবে খুব লাভজনকও নয়। ফলে এই প্রকল্প নিয়ে শুধুই দিবাস্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।"
প্রবেশদ্বার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি সরিয়ে নেওয়া অনেকের কাছে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, "যে জায়গায় একসময় উন্নয়নের ঢাক পেটানো হত, এখন সেখানে নিস্তব্ধতা। তোরণ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।"
বিজেপির অভিযোগ, স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের জমি ও কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে এবং শিল্পপতিদের কাছে বিশাল সম্ভাবনার ছবি তুলে ধরে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হলেও প্রকল্পের বাস্তবতা ছিল অনেকটাই অনিশ্চিত। দেউচা-পাঁচামির প্রবেশমুখে এখন দাঁড়িয়ে থাকা নিরাভরণ তোরণ যেন এক নীরব প্রতীক- যে স্বপ্ন একদিন আলো ছড়িয়েছিল, আজ তার রং ফিকে। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মুছে গিয়েছে সেই মুখ।
