একটা, দুটো করে কুকুর গুনছেন সরকারি কর্মীরা! একই কুকুর যাতে দু'বার গণনাতে না চলে আসে তাই মোবাইল ক্যামেরাতে ছবিও তুলে রাখতে হচ্ছে। ভোটের আবহে সুপ্রিম নির্দেশ মানতে পুরুলিয়ায় (Purulia) রীতিমতো কালঘাম ছুটছে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের।
শুধু কি কুকুর গণনা? এই কুকুর যাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্কুল, হাসপাতাল ক্যাম্পাসে না ঢুকতে পারে তার জন্য অস্থায়ী বেড়া দেওয়া হয়েছে কিনা? সীমানা প্রাচীর নির্মাণে পদক্ষেপ ঠিক কতদূর? কুকুর আটকাতে সিকিউরিটি পার্সোনাল নিয়োগ হয়েছে তো? এইসব প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাব দিয়ে বিভিন্ন দপ্তরকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে রিপোর্ট আকারে পাঠাতে হচ্ছে। রাজ্যের নির্দেশিকা অনুযায়ী গত ৩রা ফেব্রুয়ারি এই বিস্তারিত তথ্য সমেত রিপোর্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্ত এসআইআরের কাজে সরকারি কর্মীরা তুমুল ব্যস্ত থাকায় তা হয়নি। এদিকে খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে রাজ্যকে হলফনামা দিতে হবে। ফলে পুরুলিয়ায় ঘুম ছুটেছে সরকারি কর্মী থেকে বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিকদের। এমনকী পুরসভারও। আর এই কাজে হিমশিম অবস্থায় বিভিন্ন দপ্তর একে অপরের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) সুদীপ পাল বলেন, " কুকুরের সংখ্যা কত? ক্যাম্পাসে যাতে না ঢোকে তার জন্য যা যা আদেশনামা রয়েছে তার ভিত্তিতে কী কী কাজ হয়েছে তা বিভিন্ন দপ্তর সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পাঠাচ্ছে।"
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান-সহ স্কুল, হাসপাতাল, ক্রীড়া কমপ্লেক্স, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তাই সম্প্রতি পুরুলিয়া (Purulia) জেলা প্রশাসনিক ভবনে এই বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠক থেকেই জানা যায়, দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল-সহ সমস্ত প্রাথমিক ও ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্র মিলিয়ে কুকুরের সংখ্যা ২৮৬। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতেই বা কত? এই কাজ এখনও করেই ওঠা যায়নি। এই কাজের সামগ্রিক দায়িত্বে থাকা পুরুলিয়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) সুদীপ পাল বলেন, " কুকুরের সংখ্যা কত? ক্যাম্পাসে যাতে না ঢোকে তার জন্য যা যা আদেশনামা রয়েছে তার ভিত্তিতে কি কি কাজ হয়েছে তা বিভিন্ন দপ্তর সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পাঠাচ্ছে।"
প্রতীকী ছবি
পুরুলিয়া প্রশাসনিক ভবন ক্যাম্পাসে কুকুরের সংখ্যা কত? প্রশাসন বলছে, সেই কাজ চলছে। পুরুলিয়া, রঘুনাথপুর ও ঝালদা পুরসভাও প্রশাসনের ওই বৈঠকে জানাতে পারেনি তাদের ক্যাম্পাসে কুকুরের সংখ্যা কত। তবে গণনার পাশাপাশি ওই কুকুরদেরকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর। সেই সঙ্গে টিকা ও বন্ধ্যাত্বকরণ রয়েছে। কিন্তু এই কাজ করবে কে? ওই বৈঠকে প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের আধিকারিকরা বলেন, "এ তো আর মানুষ নয় যে টিকা নিতে বা ইনজেকশনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেবে?" তাই ডগ ক্যাচিং-র জন্য পথ কুকুরদের নিয়ে কাজ করা দুটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে ওই বৈঠকে ডাকা হয়। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা ওই বৈঠকে থাকা সকলকে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বৃহৎ কাজে অর্থ যোগাবে কে? তাই শহরগুলিতে দায়িত্ব পড়ে পুরসভার ঘাড়ে।
প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের আধিকারিকরা বলেন, "এ তো আর মানুষ নয় যে টিকা নিতে বা ইনজেকশনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেবে?"
বৈঠকে আসা এক্সিকিউটিভ অফিসার ও পুর প্রতিনিধিদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয় আশ্রয়স্থলের জায়গা খুঁজতে। রঘুনাথপুর, ঝালদা থেকে পুরুলিয়া শহর বড় হওয়ায় ওই শহরে ১০টি করে ২০টি কুকুর রাখার জন্য দুটি আশ্রয়স্থলের নির্দেশ দেওয়া হয়। রঘুনাথপুর ও ঝালদা পুরসভাকে আপাতত একটি করেই কুকুরের আশ্রয়স্থল খুঁজতে বলা হয়েছে। এরপর প্রত্যেকটি কুকুরের টিকা ও বন্ধ্যাত্বকরণের জন্য কত খরচা পড়বে তার একটি হিসাব ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রশাসনের কাছে জমা করেছে। সেই ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রক্রিয়া চলবে। শহর এলাকায় এই কাজ কিছুটা এগোলেও ব্লক স্তরে সেভাবে কোনো বৈঠক-ই হয়নি। তাই জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অশোক বিশ্বাস ওই বৈঠকে থাকা সমস্ত ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকদেরকে নির্দেশ দেন বিডিও এবং যুগ্ম বিডিওদের সঙ্গে বৈঠক দ্রুত সেরে ফেলতে। যাতে কোনভাবেই সুপ্রিম কোর্ট অবমাননা না হয়। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কথায়, "স্বাস্থ্য দপ্তরে কত কুকুর রয়েছে তা আমরা গণনা করে আমাদের বিভাগকে জানিয়ে দিয়েছি। এছাড়া ক্যাম্পাসে কুকুর আটকাতে যা যা করণীয় সেটাও আমরা জানিয়েছি।"
জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কথায়, "স্বাস্থ্য দপ্তরে কত কুকুর রয়েছে তা আমরা গণনা করে আমাদের বিভাগকে জানিয়ে দিয়েছি। এছাড়া ক্যাম্পাসে কুকুর আটকাতে যা যা করণীয় সেটাও আমরা জানিয়েছি।"
এই কুকুর আটকাতে দীর্ঘমেয়াদী কাজ হিসেবে সীমানা প্রাচীর ও সিকিউরিটি পার্সোনাল নিয়োগ যে সম্ভব হয়নি এই জেলায় তা কার্যত সকল দপ্তর-ই সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানিয়েছে। তবে স্কুলগুলিতে কুকুর তাড়ানোর সিকিউরিটি পার্সোনাল হয়েছেন এই কাজ সুষ্ঠুভাবে রূপায়ণে নোডাল অফিসারের দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকরাই। পুরুলিয়ার বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক)মহুয়া বসাক বলেন, "আমাদেরকে যা ফরম্যাট পাঠানো হয়েছিল, তাতে গণনার কথা বলা হয়নি। কুকুর আটকাতে যা যা করণীয় তার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা তা আমরা রিপোর্ট আকারে পাঠিয়ে দিয়েছি। সিকিউরিটি পার্সোনালের কাজ করছেন প্রত্যেকটি স্কুলের নোডালের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরাই।" পথ কুকুরদের নিয়ে কাজ করা পুরুলিয়া শহরের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অর্কাশীষ দরিপা বলেন, "ওই বৈঠকের পর তো আর কোনও নির্দেশ আসেনি। এছাড়া অর্থের একটা বিষয়। তাছাড়া সামনে ভোট। সেজন্যই বোধহয় দেরি হচ্ছে। তবে আমরা আমাদের মত কাজ করছি।"
