স্বস্তি। না কি অঙ্কের মারপ্যাঁচে অস্বস্তি বাড়ানো! সিগারেট, পান মশলা, তামাকে জিএসটি (GST on Beedi) বাড়লেও পরের মাস থেকে বিড়িতে তা কমিয়ে কেন্দ্র সরকার গ্রামীণ শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা দিল বলে দাবি করেছিল। জিএসটি কমানোর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এবার যে সব সংস্থা এই শিল্পক্ষেত্রে রাজ্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি দিচ্ছে না, ও শ্রমিকস্বার্থ সুরক্ষিত করছে না, তাদের কাছে সেই পাওনা কার্যকর করতে চাপ দিতে উদ্যোগী শ্রমিক সংগঠনগুলি। কিন্তু মালিকদের সংগঠনের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, বিড়ি শিল্পে আগে এক্সাইজ ডিউটি ছিল না। এবার তামাকে তা চাপানো হল। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র শিল্প বাঁচাতে বিড়ি শিল্পে জিএসটি কমানো আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের একটা মেগা ধাপ্পা। ঘুরিয়ে আসলে বিড়ি শিল্পকে একটা ধাক্কা দেওয়া হল।
আর পালটা শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, সব মিলিয়ে হিসাব করলে স্পষ্ট হচ্ছে, এক হাজার বিড়িতে কম করে ৪০ থেকে ৫০ টাকা সাশ্রয় হবে মালিকপক্ষের। সেই লাভের কিছুটা শ্রমিকদের মজুরিখাতে বরাদ্দের দাবি তুলেছেন তাঁরা। কারণ, সিগারেট, পানমশলার দাম বাড়লেও বিড়িতে তা হয়তো স্থিতিশীল থাকবে। দেশের মধ্যে সব চেয়ে বেশি বিড়ি শ্রমিক মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহকুমায়। শুধু ওই মহকুমাতেই প্রায় ১১ লক্ষ শ্রমিক রয়েছেন যাঁদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ। মহিলাদের আয়ের সূত্রে সেখানকার গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা। মুর্শিদাবাদে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় চার হাজার বিড়ি কারখানা মালিক রয়েছেন। জেলায় শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষ।
বিড়ি তৈরি। ছবি: সংগৃহীত।
এ ছাড়া মালদহ, নদিয়া, বীরভূম, উত্তর ২৪ পরগনা ও উত্তর দিনাজপুরেও কয়েক লক্ষ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই শিল্প অর্থনীতির চাকা কীভাবে ঘোরায় তা স্পষ্ট হয় ২০২৩ সালে শুধু মুর্শিদাবাদ থেকে প্রায় ২৫৭৮ কোটি টাকা বিড়ি শিল্পের জিএসটি আদায়ে। কেন্দ্রের ঘোষণায় ফেব্রুয়ারি থেকে কেন্দু পাতায় জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হচ্ছে। এটা যেমন স্বস্তির তেমনই অস্বস্তির এক্সাইজ ডিউটি ১০ শতাংশ তামাকের উপর চাপানোয়। মালিকদের সংগঠনের পক্ষে রাজকুমার জৈন বলেছেন, "মোট জিএসটি ছিল ২৮ শতাংশ। তা কমে দাঁড়াল ১৮ শতাংশ। কিন্তু এক্সাইজ ডিউটি ১০ শতাংশ চাপানোয় সব মিলিয়ে তো লাভ হল না।" কিন্তু শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের হিসাব, সব মিলিয়ে তো উৎপাদন খরচ কমল। হাজার বিড়ি (ফিনিশড) তৈরিতে লাগত মোটামুটি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তার কর কমল ১০ শতাংশ। অর্থাৎ হাজার বিড়িতে মোটামুটি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা জিএসটি কম লাগবে। সে ক্ষেত্রে হাজার বিড়িতে তামাক লাগে ২৫০ গ্রাম, যার দাম মোটামুটি ৫০ টাকা। তামাকের কর ১০ শতাংশ বাড়ায় সেটা দাঁড়াবে ৫৫ টাকায়। কেন্দুপাতাতেও কর কমেছে। ফলে গড়ে আদতে আয় বাড়বে। জঙ্গিপুর মহকুমা বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক, আইএনটিইউসি নেতা আলি রেজা বলেছেন, "আমরা চাই মালিকরা লাভ করুন। কিন্তু তার সুবিধাও শ্রমিকশ্রেণি পাক, মজুরি বাড়ক। আমরা সেই দাবি করেছি।" একই দাবি এসইউসির শ্রমিক সংগঠনের নেতা প্রবীর দের। প্রবীরবাবু বলেছেন, "জিএসটি কমানোয় যে আর্থিক সুবিধা, তা শ্রমিকদের শেয়ার করা উচিত। কেন্দ্রের উচিত শ্রমিক কল্যাণেও বড় অংশ বরাদ্দ করা।"
মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক, দলের শ্রমিক সংগঠনের জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি আমিরুল ইসলাম বলেন, বিড়িতে জিএসটি কমায় কিছুটা হলেও শিল্পের লাভ হবে। সেই লাভের কিছুটা শ্রমিকদের পাওয়া উচিত। আমাদের সংগঠন তো শ্রমিকদের স্বার্থে চার্টার অফ ডিমান্ড পেশ করে ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে। বহুক্ষেত্রেই তাঁরা বঞ্চিত থাকেন এটা ঠিকই। রাজ্য সরকারও সেটা দেখছে। বাম আমলে তো বিড়ি শ্রমিকরা কিছুই পেতেন না বলে অভিযোগ বিধায়ক আমিরুলের। সিটু নেতা, মুর্শিদাবাদ জেলা বিড়ি মজদুর অ্যান্ড প্যাকার্স ইউনিয়নের পক্ষে আজাদ আলি বলেছেন, "এতে অবশ্যই এই শিল্পের লাভ হল। মালিকরা অবশ্য তা মানবেন না। কারণ, তা হলে তো শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি দিতে হবে। অন্য সুযোগ-সুবিধাও দিতে হবে। তা ওঁরা দিতে চান না। আমরা এই সব পাওনার দাবিতে আগামী ১৩ জানুয়ারি জঙ্গিপুর মহকুমাশাসকের দপ্তর অভিযান করব বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে।" বিড়ি শিল্পে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ২০২০ সালে ঠিক হয় ২৬৭ টাকা ৪৪ পয়সা। তা অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর করা যায়নি। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যে ২০২ টাকার ন্যূনতম মজুরির চুক্তি হয়েছিল মুর্শিদাবাদে তাও সব ক্ষেত্রে মানা হয় না বলেই অভিযোগ অনেকের। এবার শ্রমিক সংগঠনগুলি চায়, মালিকরা জিএসটির সুবিধা পেলে তাঁদের কথা ভাবুন।
