মাও বঙ্গ ব্রিগেডকে বাগে আনতে সাপ্লাই লাইন কাট! সেই বাম আমলে দেখানো পথেই নজরবন্দি অপারেশন শুরু করল যৌথ বাহিনী। বৃহস্পতিবার তিন রাজ্যের পুলিশের বৈঠকের পরেই বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানার স্পর্শকাতর এলাকায় অপারেশন শুরু হয়েছে। রাজ্যের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম সহ ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের ঘাটশিলা এলাকার পাহাড়-জঙ্গল সন্নিহিত সমস্ত হাটে সাদা পোশাকে নজরদারি শুরু করেছে বাহিনী। পাশাপশি এলাকার কোয়াক চিকিৎসক, যাত্রীবাহী বাস থেকে ছোট গাড়ির রীতিমতো তথ্যপঞ্জি তৈরি করে তাদের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের বিষয়টি আরও মজবুত করছে পুলিশ। যাতে ওই এলাকায় অপরিচিত ও সন্দেহজনকদের সমস্ত তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া পাহাড় জঙ্গল ঘেরা পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকের বেশে বাইরে থেকে কেউ আসছে কি না তার জন্য তাদের উপরও সাদা পোশাকে নজরদারি শুরু হয়েছে। যাতে খাদ্য সামগ্রী এবং অন্যান্য সব রকম সাপ্লাই লাইন কাট করা যায়।
এই কোণঠাসা অবস্থায় ওই গেরিলা সদস্যরা অন্যত্র কোথাও যাতে আত্মগোপন না করতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখে চলছে নজরদারি।তবে এই বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি দুই রাজ্যের পুলিশের আধিকারিকেরা। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, বর্তমানে মাওবাদী কমান্ডার আকাশ ওরফে অসীম মণ্ডলের স্কোয়াডের সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতা নিয়ে বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানায় ঘোরাফেরা করছে। একেবারে বিশ্বস্ত গ্রামের এক-দু'জন ছাড়া কারও সঙ্গেই তারা দেখা করছেন না। শুধু তাই নয়, অতীতের বিভিন্ন ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিষক্রিয়ার ভয়ে গ্রাম থেকে খাবার পর্যন্ত তারা নিচ্ছেন না।
সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডে আত্মসমর্পণকারী একাধিক মাও নেতা-নেত্রী এবং ধৃত সিপিআই মাওবাদীর পলিটব্যুরোর সদস্য মিসিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আকাশের স্কোয়াড সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য হাতে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। আকাশ-সহ দু'থেকে তিনজনের কাছে স্বয়ংক্রিয় একে ৪৭ আছে। এছাড়া কয়েকটি সেলফ লোডিং রাইফেল ছাড়া সামান্য পরিমাণে গুলি এবং কিছু ল্যান্ড মাইন তৈরির মশলা রয়েছে।
মাওবাদী আকাশ ওরফে অসীম মণ্ডল, পুলিশের হাতে আসা সাম্প্রতিক ছবি
তাহলে খাবার আসছে কোথা থেকে? গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন পুরুলিয়া,ঝাড়গ্রাম এবং ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলা এলাকায় কয়েকটি গ্রামীণ হাটে মাও সদস্যরা সাদা পোশাকে এসে বাজার করে গিয়েছেন। তারপর জঙ্গলের মধ্যেই রান্না করে খাচ্ছেন। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডে আত্মসমর্পণকারী একাধিক মাও নেতা-নেত্রী এবং ধৃত সিপিআই মাওবাদীর পলিটব্যুরোর সদস্য মিসিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আকাশের স্কোয়াড সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য হাতে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। আকাশ-সহ দু'থেকে তিনজনের কাছে স্বয়ংক্রিয় একে ৪৭ আছে। এছাড়া কয়েকটি সেলফ লোডিং রাইফেল ছাড়া সামান্য পরিমাণে গুলি এবং কিছু ল্যান্ড মাইন তৈরির মশলা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি লড়াই করলে তাদের মৃত্যু ছাড়া পথ নেই। অন্যদিকে আকাশের কাছে খুব সামান্য নগদ অর্থ আছে। যা দিয়ে কয়েক মাসের রেশন সামগ্রী ও অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র কেনা সম্ভব। মাওবাদীদের ওই স্কোয়াডের যে অর্থ সংকট রয়েছে, তা মাস খানেক আগেই ঝাড়খণ্ড পুলিশ হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছে। কারণ দলমা পাহাড়ের নিচে পটমদা এলাকায় বেশ কয়েকজন পেট্রোল পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে চিঠি এবং ফোন করেছিল আকাশের সহযোদ্ধা বীরেন ওরফে সাগর। ফলে এই পরিস্থিতিতে হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মুখে কতদিন বন্দুক নিয়ে তারা জঙ্গলে তারা লুকিয়ে থাকবেন, সেটাই প্রশ্ন।
সারান্ডার জঙ্গলে অভিযানে থাকা এক আধিকারিক জানিয়েছেন, হাটে নজরদারির মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। তাছাড়া ভয় পেয়ে তারা না এলে খাদ্য সংকটে পড়বে। অন্যদিকে বর্ষার মরশুমে যে এলাকায় বর্তমানে তারা থাকছেন সেই সব এলাকা ম্যালেরিয়া প্রবণ। ফলে পর্যাপ্ত ওষুধপত্রও তাদের প্রয়োজন। অন্যদিকে অতীতে দেখা গিয়েছে মাওবাদীদের সেকেন্ড ইন কমান্ড কিষানদা-সহ মিসির বেসরার মতো অনেকেই চাপে পড়ে এক জায়গা থেকে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাস, ছোট গাড়ির সাহায্য নেয়। তাই সেখানেও নজরদারি চলছে।
ইতিমধ্যেই কয়েকদিন ধরে কোটি টাকার 'মোস্ট ওয়ান্টেড' আকাশের অবস্থানের যে খবর বাহিনীর হাতে এসেছে, তাতে তারা প্রতিদিন ডেরা বদল করছে। তবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দূরত্ব মেরেকেটে ১ থেকে ৫ কিমি। ফলে কয়েক দিনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে দেখা গিয়েছে পাহাড়ি জঙ্গলে ১৫ কিমি মধ্যেই তারা গত দু'সপ্তাহ ধরে থাকছেন। তবে এই পরিস্থিতিতে যাতে বাইরে থেকে পর্যটকের বেশে কেউ এসে অর্থ, গোলা-বারুদ জোগান দিতে না পারেন সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। কারণ এই এলাকায় বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি অতিথি আবাস রয়েছে। বছরের অন্যান্য সময়ের মতো মনসুন ট্যুরিজমেও ব্যাপক পর্যটক ভিড় করেন।
