আকাশ ছোঁয়া অভাব। তবুও মাটি কামড়ে চলছে জীবন সংগ্রাম। চোখে হাজারো স্বপ্ন, স্কুলের গণ্ডি পেরনোর আগেই ছাড়তে হয়েছে নিজের নিজের ভিটে। এত লড়াইয়ের পরেও হাল ছাড়েনি সাগর। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সফলতা ধরা দিয়েছে কালনার খেটে খাওয়া ছেলেটার পরিশ্রমে।
উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় ভিন রাজ্যে 'হোটেল বয়' হিসাবে কর্মরত এক কৃতি ছাত্র! যুগ্মভাবে নবম স্থান অধিকার করে নজর কাড়ল কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সাগর মণ্ডল। নদীয়া জেলার বাসিন্দা সাগরের প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮ (৯৭.৬ শতাংশ)। চোখে আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন। তবে সংসারের অভাবে এ যে স্বপ্নাতীত। তাই কোচিংয়ের টাকা জোগাতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই মা-বাবার মতো সেও গুজরাটে পাড়ি দেয়। তারপরেও এই নজরকাড়া রেজাল্ট! যা তাক লাগিয়ে দেয় সকলকে। প্রধান শিক্ষক মিলন মান্ডি বলেন, "অভাবী মেধাবী সাগর দৃষ্টান্ত তৈরি করল। ওর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।"
নদিয়ার শান্তিপুর থানার নৃসিংহপুরের বড়ডাঙাপাড়ার বাসিন্দা সাগর মণ্ডল। মাধ্যমিক পর্যন্ত গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করেছে। মাধ্যমিকে অল্পের জন্য মেধা তালিকা হাতছাড়া হলেও সেই আশাপূরণ হল উচ্চ মাধ্যমিকে। সংসারের অভাবে সাগরের মা-বাবা দু'জনকেই পাড়ি দেন গুজরাটে। একাদশের ছাত্র সাগর পড়ে থাকে গ্রামের বাড়িতেই। একা হাতেই সংসার সামলে চালিয়ে গিয়েছে পড়াশোনা। মা-বাবার পাঠানো অর্থেই কোনওরকমে চালিয়ে নিয়ে নিজেই নিজের অভিভাবক হয়ে ওঠে সাগর। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়তি খরচ মেটাতে কে? সেই চিন্তা তাড়া করে বেড়াত সাগরকে। তাই উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই অর্থের জোগানে সাগরও গুজরাটে গিয়ে হোটেল বয়ের কাজ নেয়। খাবার টেবিল পরিষ্কার, বাসনপত্র ধোয়া, ঝাড়ু দেওয়ার কাজ বেছে নেয়। বৃহস্পতিবার টিভিতে রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করার নজরকাড়া রেজাল্ট দেখে প্রথমে সেও বিশ্বাস করতে না পারলেও পরে সে বুঝতে পারে তার কঠিন লড়াই সাফল্য এনে দিয়েছে। ছেলের আনন্দে খুশি মা সুষমা বলেন, "২ মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সংসারে অভাব ছিল। ছেলেকে বাড়িতে রেখে চলে গিয়েছিলাম। কঠিন লড়াই ওকে সফলতা এনে দিয়েছে। রেজাল্ট নিতে ছেলেকে নিয়ে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বাড়ি ফিরব।" অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও শিক্ষার সঙ্গে আপোস নয়। তা আরও একবার প্রমাণ করল সাগর।
