ব্রতদীপ ভট্টাচার্য: চোখের জল শুকোচ্ছেই না। শোকে চুরমার হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়েও দেশাত্মবোধে অবিচল সৌমেন মালিক।শহিদের পিতা!
বৃহস্পতিবার রাতে দার্জিলিং পাহাড়ের জঙ্গলে গুরুংবাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মারা গিয়েছেন সৌমেনবাবুর ছেলে, রাজ্য সাব ইন্সপেক্টর অমিতাভ মালিক। মধ্যমগ্রামে শরৎকানন পাটুলির বাড়িতে বসে শুক্রবার সকালে সেই মর্মান্তিক সংবাদ এসে পৌঁছনোর পর সংসারের ছন্দ তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। মা গঙ্গাদেবী শয্যাশায়ী। প্রায় সংজ্ঞাহীন। ভাই অরুণাভ হতভম্ব। খবরটা যে সত্যি, তা যেন এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না বারো ক্লাসের কিশোর পড়ুয়া। আর এই অসহনীয় দুঃখের মধ্যেও নিজেকে শক্ত রেখে সৌমেনবাবু জানালেন, “ছোট ছেলেকেও ফৌজে পাঠাব।”
ঘটনা হল, বড় ছেলে পুলিশে চাকরি করুক, এটা বাবা-মা মোটেই চাননি। বরাবরের মেধাবী অমিতাভ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর আইআইটি মুম্বইয়ে এমটেক-এ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে যেতে পারেননি। তারপর ইন্দো-টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশে চাকরি পান। বাড়ির আপত্তিতে তা ছেড়েও দেন। কিন্তু ছেলে ২০১৪ সালে যখন রাজ্য পুলিশে চাকরি পেল, তখন আর আটকে রাখা যায়নি। এক বছর ট্রেনিং সেরে ২০১৫ সালে দার্জিলিং সদর থানায় প্রথম পোস্টিং হয়। সেই থেকে তিনি পাহাড়ের ডাকাবুকো অফিসার হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পুলিশ কর্তারা জানাচ্ছেন, অল্প ক’দিনেই ছেলেটির বিস্তর নাম-ডাক হয়েছিল ফোর্সে। দক্ষ অফিসার ছিল।
[বাংলাকে ভাগ হতে দেব না, সংকল্প ছিল শহিদ অমিতাভের]
এরপরও অমিতাভ ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছিলেন। বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল, ছেলে পুলিশ না হয়ে ব্যাঙ্ক অফিসারের নিশ্চিন্ত জীবন বেছে নিক। কিন্তু দেশসেবার তাগিদ অমিতাভকে ফিরতে দেয়নি। সেই আক্ষেপ কয়েকদিন আগে পর্যন্তও সৌমেনবাবু বয়ে বেড়িয়েছেন। পাহাড়ে গন্ডগোল বাধা ইস্তক তাঁরা সব সময় ভয়ে থাকতেন। প্রায়ই ফোনে ছেলেকে বলতেন, “আর দরকার নেই বাবা। বদলি নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যা। নয়তো চাকরি ছেড়ে দে।” কিন্তু অমিতাভর কর্তব্যবোধ টলেনি। কয়েকদিন আগেও বাবাকে তিনি ফোনে বলেছিলেন, “পাহাড় শান্ত না হওয়া অবধি আমি কোথাও যাব না। প্রাণ থাকতে বাংলাকে ভাগ হতে দেব না।” খুব সম্প্রতি তিনি বাবাকে জানিয়েছিলেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের দায়িত্ব পড়েছে তাঁর উপর। সফল হলে কালীপুজোয় বাড়ি ফিরবেন।
ছেলে আর ফিরবে না। এই কঠিন বাস্তব সৌমেনবাবুর মনটাকে যেন অকস্মাৎ বদলে দিয়েছে। এখন তিনি চাইছেন, যারা দেশকে টুকরো টুকরো করতে চায়, তাদের শায়েস্তা করতে আরও অমিতাভ দরকার। যে জন্য ছোট ছেলে অরুণাভকেও তিনি পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে পাঠাতে দু’বার ভাববেন না। আরুণাভও তৈরি দাদার পথে হাঁটতে। “আমিও ফোর্সে যেতে চাই। বিশেষ করে এয়ারফোর্সে।” – বাবার পাশে বসে শক্ত মুখে এদিন জানাল অরুণাভ। আর ছোট ছেলের কাঁধে হাত রেখে সজল চোখে সৌমেনবাবু বললেন, “অমিতাভ দেশের জন্য লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। ও আমাদের গর্ব। আমার আরও ছেলে থাকলে তাদেরও অমিতাভর মতো তৈরি করতাম।”
এদিকে, শনিবার শহিদ অমিতাভর দেহ এসে পৌঁছবে শহরে। দেহ নিতে বিমানবন্দরে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রাজ্য পুলিশের ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ, মধ্যমগ্রামের বিধায়ক তথা চেয়ারম্যান রথীন ঘোষ-সহ অন্যান্য পুলিশকর্তারা হাজির থাকবেন বলে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই মৃত এসআই-এর বাবাকে ফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু নিয়মের খাতিরে নয় মানবিকতার কথা মাথায় রেখেই তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
[ধানজমিতে বিকট শব্দে ফুটছে জল, তোলপাড় পটাশপুর]
The post ছোট ছেলেও ফৌজে যাবে, বলছেন গর্বিত শহিদের বাবা appeared first on Sangbad Pratidin.
