সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: ঝাড়খন্ড ছুঁয়ে থাকা অরণ্যঘেরা পুরুলিয়া। যা আগে ছিল জঙ্গলমহলের জেলা। এখন আর তার কোনও অস্তিত্ব না থাকলেও পুরুলিয়ার সঙ্গে আজও জুড়ে রয়েছে জঙ্গলমহল বা বনমহল শব্দবন্ধ। আর সেই অরণ্য নির্ভর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা আদিবাসী জনজাতির বাস এই মাটিতে। জনসংখ্যার নিরিখে এ রাজ্যের তৃতীয় সর্বোচ্চ। পুরুলিয়ার মোট জনসংখ্যার ১৮.৪৫ শতাংশ।
আর সেই আদিবাসীর মধ্যে পুরুলিয়ায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে সাঁওতাল। তাই ওই জনজাতির মন পড়ে তাদের দাবি-দাওয়া শুনে ওই উপজাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সাঁওতালি ভাষা শিখছেন পুরুলিয়ার নতুন জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার যথাক্রমে সুধীর কোন্থাম ও বৈভব তেওয়ারি। একেবারে টিউটর নিয়ে। তবে ওই গৃহশিক্ষক ওই জনজাতির সরকারি কর্মী-ই। নানান প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝে তাদের কাছেই সাঁওতালি ভাষার পাঠ নিচ্ছেন জঙ্গলমহলের এই দুই আমলা। জেলাশাসকের মাতৃভাষা তেলেগু। আদি বাড়ি হায়দ্রাবাদে। পুলিশ সুপার হিন্দিভাষী। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের বাসিন্দা। এহেন দুই-আমলার সাঁওতালি ভাষার পাঠকে কুর্নিশ জানিয়েছেন আদিবাসী জনজাতির মন্ত্রী, রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিভাগের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু। তিনি বলেন, "একজন আদিবাসী জনজাতির মানুষ হয়ে আমার কাছে এই বিষয়টি গৌরবের। সেই সঙ্গে এই জনজাতির মানুষজনদের আরও উন্নয়নে, তাদের আরও কাছাকাছি আসতে ডিএম, এসপি-র সাঁওতালি ভাষায় পাঠ নেওয়া সত্যি প্রশংসনীয়।"
দুই আমলার এই বড় কাজের শুরুটা হয়েছিল কয়েকদিন আগে রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের ২৩ তম সাঁওতালি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে। পুরুলিয়ার মানবাজার ২ ব্লকের শুশুনিয়া ফুটবল মাঠে। সেখানে জেলাশাসক সাঁওতালি ভাষায় বক্তৃতা রাখেন। ওই ভাষাতেই তিনি স্মরণ করেন সিধো-কানহো-বিরসা থেকে পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু, সারদা প্রসাদ কিস্কুর মতো গুণী মানুষজনকে। তবে ওই বক্তৃতা জেলাশাসক নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। যা দেখে তিনি সহজেই বলতে পারেন। আর সেই কাজ তিনি সাফল্যের সঙ্গে করতে পারায় এবং এই জনজাতির মানুষজনদের আরও কাছাকাছি যেতে তারপর থেকেই সাঁওতালি ভাষা শেখা শুরু করেন জেলাশাসক। ওই অনুষ্ঠানেই ছিলেন পুলিশ সুপার। জেলাশাসকের সাঁওতালি ভাষণ মুগ্ধ করেছিল তাঁকে। তারপর তিনিও জেলা পুলিশের আদিবাসী জনজাতির একাধিক পুলিশ কর্মীর কাছ থেকে এই ভাষার পাঠ নেওয়া শুরু করেন। পুলিশ সুপার বলেন, "খুব তাড়াতাড়ি শিখে যাব। সাঁওতালি ভাষা শিখে নিলে এই জেলার কাজে আরও সুবিধা হবে।"
জেলাশাসক সুধীর কোন্থাম।
এসআইআর শুরুর আগেই ২০১৪ ব্যাচের আইএএস অফিসার সুধীর কোন্থাম হলদিয়া ডেভলপমেন্ট অথরিটির সিইও থেকে পুরুলিয়া জেলাশাসকের চেয়ারে বসেন। আর তখন থেকেই তিনি এই জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গ্রামের অবস্থা কি তা নিজের চোখে দেখছেন। কিন্তু তারা যে ভাষায় কথা বলেন তা সঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না তিনি। এই উপলব্ধি থেকেই জেলাশাসকের সাঁওতালি ভাষায় পাঠ নেওয়া। তাঁর কথায়, "ওই জনজাতির মানুষের মন বুঝে, তাদের দাবি-দাওয়া শুনে, তাদের সঙ্গে কথা বলে যাতে সফলভাবে কাজটা করা যায় সেই কারণেই আমার সাঁওতালি ভাষা শেখার সিদ্ধান্ত।"
তিনি দক্ষিণের বাসিন্দা হলেও খড়গপুর থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিটেক করেন। সেই সময় থেকেই সাঁওতালি ভাষা তিনি শুনে আসছেন। আর এবার কাজের সূত্রে জেলাশাসকের চেয়ারে বসে জঙ্গলমহল জেলার দায়িত্ব নিয়ে বুঝেছেন বাংলার সঙ্গে জনজাতিদের এই ভাষাটাও রপ্ত করতে হবে।
পুলিশ সুপার বৈভব তেওয়ারি।
অন্যদিকে ২০১২ ব্যাচের আইপিএস বৈভব তেওয়ারি আগে বাঁকুড়ার পুলিশ সুপার ছিলেন। ওই জেলাতেও আদিবাসী মানুষজনের বসবাস রয়েছে। তবে পুরুলিয়ায় তার চেয়ে অনেকটাই বেশি। অযোধ্যা পাহাড় জুড়ে যে কম-বেশি ৭০ টি গ্রাম রয়েছে এই সকল গ্রামের অধিকাংশ মানুষজনই সাঁওতালি ভাষায় কথা বলেন। তাই তাদের কাছাকাছি গিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে ওই ভাষায় কথা বলাটা ভীষণই জরুরী। না হলে কোথাও যেন দূরত্বটা থেকেই যাবে। আসলে রাজ্যে পালাবদলের পর পুলিশ আর শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়। সাধারণ প্রশাসনের মত গ্রামে গ্রামে গিয়ে উন্নয়নের কাজেরও শরিক।
