হোয়াটসঅ্যাপ মিলিয়ে হাতে হাতে টিফিন বক্স ভরে স্কুটির এক্সেলেটরে চাপ বা অর্ডার মতো নানা সামগ্রী নিয়ে সাইকেলের বেল বাজিয়ে পথে। স্কুটি বা সাইকেলের সঙ্গে ছুটছে ওদের স্বপ্নও। হাজার প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াইয়ে আজ দৃষ্টান্ত আসানসোল ও জামুড়িয়ার দুই কন্যা। পূজা আর ঝিলিক।
চোখে স্বচ্ছলতার স্বপ্ন আর কাঁধে পরিবারের দায়ভার। বাড়ি থেকে তিন চার কিলোমিটার দূরেও সাইকেলে করে অর্ডার মাফিক খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন আসানসোল মহীশীলা কলোনির তিন নম্বর এলাকার পূজা রজক। আসানসোলের কলেজ ছাত্রী। দিন-দরিদ্র পরিবারে মা-বাবাকে আর্থিক সাহায্যের জন্য রোজগারের পথে নেমেছেন। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে তিনি এখন ডেলিভারি গার্ল। পূজা বলেন, "প্রতিদিন আসানসোলের বি বি কলেজের ক্লাস সামলে চাহিদামতো খাবার জোগান দিচ্ছি। খুব একটা অসুবিধা হয় না।"
অন্যদিকে সংসার আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে রানিগঞ্জে এখন 'ডেলিভারি গার্ল' ঝিলিক রুইদাস। স্কুটিতে চেপে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন গ্রাহকের অর্ডার করা নানা সামগ্রী। পুরানো স্কুটি আর জীর্ণ হেলমেট পরেই এ কাজ করে চলেছেন জামুড়িয়ার বেনালি গ্রামের ঝিলিক রুইদাস। জামুড়িয়ার মেয়ে হলেও ঝিলিকের কর্মক্ষেত্র রানিগঞ্জ। জেমারি থেকে জেগেনগর বাজার, বেলিয়াবাধান থেকে নিমচা বহু গ্রামেই ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছে ঝিলিক। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট অনলাইন সংস্থার সামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন তিনি। বছরখানেক আগে থেকেই বদলে গিয়েছে ঝিলিকের জীবন। রোগে আক্রান্ত হয়ে আচমকাই ঝিলিকের বাবা মারা যান। ঝিলিকদের পথে বসা অবস্থা। পরিবারে ঝিলিকই বড় মেয়ে। ছোট ভাই তখন নবম শ্রেণিতে উঠবে। মা অসুস্থ। সংসারের হাল ধরতে বাড়ি বাড়ি সময় মতো সামগ্রী পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন ঝিলিক।
বেসরকারি সংস্থার এই কাজে সময়মতো সামগ্রী গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ থাকে। বেশিরভাগ মানুষের থেকে ভাল ব্যবহার পেলেও অনেকে আবার মেয়েকে স্কুটিতে চেপে পণ্য সরবরাহ করতে দেখে বাঁকা চোখেও তাকান। সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই তাঁর। স্কুটিতে চেপে তাঁর লক্ষ্য ভাইকে উচ্চশিক্ষিত করে চাকরির যোগ্য করে তুলে মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। আসানসোলের দুই মেয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে কঠোর পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনও বাধাই বড় নয়। পরিশ্রম করে রোজগার করার মধ্যে যে আলাদা আনন্দ আছে, সেটাই তাঁদের চলার পাথেয়।
