অর্ণব দাস, বারাসত: যতবার ভোট, ততবার নিজের মতদান। বয়স দেখতে দেখতে একশোর কোঠা পেরিয়ে ১০৪-এ পৌঁছেছে। ব্রিটিশ অধীনস্ত দেশ থেকে স্বাধীন ভারত - সময়ের চাকায় অনেক কিছু দেখে ফেলেছেন স্বচক্ষে। দেখছেন আজকের এই পোড়া সময়কেও, দেখছেন রাজনীতির দুর্বিপাকে ডুবে থাকা স্বদেশকেও। আজ ১০৪ বছর বয়সী ওই বৃদ্ধাকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে অন্যের কাঁধে ভর করে যেতে হল শুনানিকেন্দ্রে। অশোকনগরের শিবানী বসু গলা তুলে বললেন, ''মনের জোর আছে, তাই এসেছি। কাজে এসেছি। যতক্ষণ লাগে, লাগুক। কাজ সেরে ফিরে যাব।'' হায় এসআইআর (SIR in West Bengal)!
বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের আগে চলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। খসড়া তালিকায় নাম-পরিচয় কোনও গন্ডগোল থাকলে সেসব ভোটারদের ডেকে পাঠিয়ে শুনানি করা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের তরফে। এই কাজ মূলত করছেন ইআরও, এইআরও-রা। বিডিও অফিস বা অন্য কোনও সরকারি শুনানিকেন্দ্রে এই কাজ চলছে। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ৮০ ঊর্ধ্ব মানুষজনের শুনানির জন্য আধিকারিকরা বাড়ি যাবেন, ভোটারকে সরাসরি শুনানিকেন্দ্রে আসতে হবে না। কিন্তু নিয়মই সার! প্রয়োগ আর কতটুকু? নইলে কি আর শীতের সকালে ১০৪ বছর বয়সি অশক্ত শরীরে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে শুনানিতে আসতে হতো অশোকনগরের শিবানীদেবীকে?
শুনানিকেন্দ্রে ১০৪ বছর বয়সি শিবানী বসু। নিজস্ব ছবি।
অশোকনগর কল্যাণগড় পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কালীতলার বাসিন্দা শিবানী বসু। কুঞ্চিত ত্বকে জীবনের ১০৪টি বছরের আঁকিবুকি। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ। তবু চলাফেরা করতে পারেন এখনও। অন্যের উপর ভর দিতে হয় - এই যা। তাহলে কেনই বা তিনি যেতে পারবেন না শুনানিকেন্দ্রে? এমনই বোধহয় ভেবেছিলেন কমিশনের কর্তারা। ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় শিবানীদেবী সহ তাঁর গোটা পরিবারের ডাক পড়েছে শুনানিতে। তাঁকেও সশরীরে কল্যাণগড় বিদ্যামন্দিরে যেতে কার্যত বাধ্য করা হল।
বৃদ্ধা অবশ্য নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে সমস্ত কষ্টই মুখ বুজে সইলেন। তাঁর কথায়, ''মনের জোরে আমি এখানে এসেছি। অনেকক্ষণ বসে আছি। তা হোক, কাজে এসেছি। কাজ সেরে তবেই ফিরব।'' বাড়ি গিয়ে এই শুনানি হলেই কি ভালো হতো? জবাবে শিবানী বসুর জবাব, ''হলে ভালো হতো, না হলে আমিই এখানে চলে এলাম।'' এসআইআর প্রক্রিয়ায় শত নজরদারির মাঝে এসব চিত্র কি চোখে পড়ছে না দিল্লির কমিশনের কর্তাদের? জবাব কিন্তু চাইবেই জনতা।
