সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: আর প্রয়োজন নেই ১৩ টি নথির। সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকের অনুমোদনক্রমে এসআইআর শুনানিতে কোন নথি না দেখিয়েই নতুন ভোটার তালিকায় নাম উঠে যাবে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকা আদিম জনজাতি বিরহোড়, টোটো ও লোধা শবর থেকে খেড়িয়া শবরদের। নির্বাচন কমিশনের এই নয়া নির্দেশে এই উপজাতিদের নাম, বাসস্থানের তালিকা সংশ্লিষ্ট ব্লকের বিডিওদের কাছে তলব করেছেন জেলাশাসকরা। আর এই কাজ করতে গিয়ে ওই জনজাতির যে সকল সদস্যদের তফসিলি উপজাতি শংসাপত্র নেই সেই কাজও করে দেবে প্রশাসন।
পুরুলিয়ার জেলাশাসক সুধীর কোন্থাম বলেন, "নথি ছাড়াই জেলাশাসকের অনুমোদনক্রমে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে বিরহোড়, টোটো, শবর জনজাতিদের। পুরুলিয়ায় খেড়িয়া শবর জনজাতিদের মোটামুটি ভাবে আধার কার্ড করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিরহোড় থেকে শবরদের যাদের জাতিগত শংসাপত্র নেই সেই কাজও আমরা করে দেবো।" আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক আর বিমলা বলেন, " কমিশন বলেছে ঠিকই। তবে আমাদের জেলায় যে টোটো জনজাতি রয়েছে তাদের সকলেরই নথিপত্র আছে। নথিপত্র নেই এইরকম বিষয় এখনও আমাদের কাছে আসেনি। তবুও আমরা বিষয়টি দেখে নিচ্ছি।" ১৪ ফেব্রুয়ারি নতুন ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত পিভিটিজি বা 'পার্টিকুলারলি ভালনারেবেল ট্রাইবাল গ্রুপ'-এ রয়েছে এই বিরহোড় ও টোটো জনজাতি। যারা ক্রমশ লুপ্তপ্রায়। জেনারেল নলেজ বা ক্যুইজের বই-এ কোন জাতি লুপ্তপ্রায় এই প্রশ্নের উত্তরে লেখা থাকে বিরহোড়। সেই জনজাতি রয়েছে পুরুলিয়ার তিনটি ব্লক বলরামপুর, বাঘমুন্ডি ও ঝালদা এক-এ। একইভাবে আদিবাসী তালিকাভুক্তের আওতায় থাকা টোটো জনজাতিদের বাস উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট ব্লকের একেবারে ভুটান সীমান্তে টোটোপাড়া গ্রামে। এছাড়াও
ওই এলাকার আরও কয়েকটি জায়গায় কয়েকটি পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৭০০। তবে বিরহোড়দের সংখ্যা আরও কম। প্রায় তিন শতাধিক। ওই সংখ্যার মধ্যে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন অনুযায়ী ১৮-র ঊর্ধ্বে ছিলেন ১৮১ জন। তাদের সকলকেই পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন ভোটার তালিকায় নিয়ে এসে বুথমুখী করতে পেরেছিল। যা পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের কাছে ছিল বড়সড় চ্যালেঞ্জ।
এই জনজাতি মূলত 'প্রোটো অস্ট্রোলয়েড' জাতিভুক্ত। সরকারি পরিভাষায় এই জনজাতি আগে 'প্রিমিটিভ ট্রাইব গ্রুপ' নামে পরিচিত ছিল। তারা এতটাই অরণ্য নির্ভর যে পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের ওই তিন ব্লক এলাকায় রাজ্য সরকার তাদের জন্য পাকা বাড়ি বানিয়ে দিলেও তারা এখনও গুহায় থাকতে ভালোবাসেন। অন্যদিকে লোধা শবর ও খেড়িয়া শবরদের সংখ্যাও ক্রমশ কমে আসছে। ঝাড়গ্রামের ৭ টি, পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৪ টি ও পূর্ব মেদিনীপুরের ১ টি ব্লকে এই জনজাতির মানুষের বসবাস। সবে মিলিয়ে লোধা শবরদের জনসংখ্যা প্রায় লক্ষাধিক। ঝাড়গ্রামের যে ৭ টি ব্লকে এই জনজাতি রয়েছে সেই ব্লকগুলি হল ঝাড়গ্রাম, বিনপুর, নয়াগ্রাম, গোপীল্লভপুর এক, সাঁকরাইল, লালগড় ও বেলপাহাড়ি। একইভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৪ টি ব্লক হল নারায়ণগড়, দাঁতন এক, দাঁতন দুই, কেশিয়াড়ি, সবং, ডেবরা, পিংলা, খড়গপুর এক, খড়গপুর দুই, মেদিনীপুর সদর, শালবনি, কেশপুর, দাসপুর এক, দাসপুর দুই ও পূর্ব মেদনীপুরের পাঁশকুড়া।
লোধা শবর উন্নয়ন ডেভলপমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান বলাই নায়েক বলেন, " আমাদের জনজাতির কয়েকজনের নথিপত্র নেই। একজন ভোটারেরও নাম বাদ দেওয়া যাবে না।" খেড়িয়া শবর জনজাতি রয়েছে শুধুমাত্র পুরুলিয়াতেই। তাদের মোট পরিবারের সংখ্যা ৩১২৭ টি। জনসংখ্যা ১৪০৪০ জন। তার মধ্যে ভোটার ৬৯৫০ জন। জেলার ১১ টি ব্লকের ১৬৮ টি টোলায় তাদের বসবাস। ওই ব্লকগুলি হলো পুরুলিয়া এক, পুঞ্চা, মানবাজার এক, মানবাজার দুই, হুড়া, বান্দোয়ান, বরাবাজার, বলরামপুর, আড়শা, পুরুলিয়া দুই, কাশিপুর। তবে আড়শা, পুরুলিয়া দুই এবং কাশিপুরে একটি বা দুটি করে শবর পরিবার আছে। পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির অধিকর্তা প্রশান্ত রক্ষিত বলেন, " আমাদের দাবি মেনে কমিশন যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে আমরা খুশি। এই তিন আদিম জনজাতির মানুষজনদেরকেই যদি নথিপত্র দেখিয়ে প্রমাণ দিতে হয় তারা মূলবাসী, এর চেয়ে আর লজ্জার কি থাকতে পারে।"
এই শবর জনজাতিকে ব্রিটিশরা 'অপরাধপ্রবণ' আখ্যা দিয়েছিল। তকমা ছিল 'জন্ম অপরাধী।' ১৮৭১ সালে 'ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট'-র অধীনে তাদেরকে নিয়ে আসা হয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৫২ সালে সেই আইন রদ হয়। তার চার বছর পর ১৯৫৬ তে তাদের 'জঙ্গলের ঘর' কেড়ে নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এখনও অরণ্যের ঠিকানা তাদের বদলায়নি। বিরহোড় দের মতো খেড়িয়া শবররাও পাহাড় জঙ্গলে থেকে শিকার করতে ভালোবাসেন। ইঁদুর, গোসাপ শিকার করে পুড়িয়ে খান। রামায়ণ, মহাভারত, চর্যাপদ এমনকি বেদ গীতাতেও শবরদের কথা বলা হয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখেই কমিশনের এই সিদ্ধান্ত।
