কাজের খোঁজে তরতাজা জোয়ান ছেলেটা কোচবিহার থেকে পাড়ি দিয়েছিল অরুণাচল প্রদেশে। সেখান থেকে আর বাড়ি ফেরা হল না। অরুণাচল থেকে ফেরার পথে অসমের কাছে ঘটে গেল চরম ঘটনাটি। গাড়িচালকের সঙ্গে বচসার জেরে মারধরে মৃত্যু হল বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক হিমাঙ্কর পালের। মার খেতে খেতেই বাবাকে ফোন করে তাঁর কাতর আর্তি ছিল, ''বাবা, আমাকে এরা খুব মারছে। বাবা, তুমি এদের ছাড়বে না। অন্যায় করছে আমার সঙ্গে।'' তারপরই ছেলের ফোন কেটে যায় এবং কিছুক্ষণ পর মৃত্যুর খবর আসে বাড়িতে। তারপর থেকেই কোচবিহারের শীতলকুচির মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের বাবার কানে ভাসছে একটাই কথা - ''বাবা, তুমি এদের ছাড়বে না।'' কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছেন, ''আমার ছেলেটাকে ওরা মেরে ফেলল। আমি এর বিচার চাই, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি চাই।''
পরিবার এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার কাজের সন্ধানে অরুণাচল প্রদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন শীতলকুচির কুর্শামারি এলাকার হিমাঙ্কর। তবে সেখানে উপযুক্ত কাজ পাননি। তাই শেষমেশ বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। বাসে চড়ে অসম হয়ে কোচবিহারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আর বাড়ি ফেরা হল না। বাবা নীতীশ পাল জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে তাঁকে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে ছেলের ফোন আসে।তাতেই হিমাঙ্করের অসহায় পরিস্থিতি প্রকাশ পায়।
অসমে নিহত কোচবিহারের পরিযায়ী শ্রমিক হিমাঙ্কর পাল। নিজস্ব ছবি
বাবার কথায়, ''ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, আমাকে খুব মারছে এরা। বাবা তুমি এদের ছাড়বে না। আমাকে এরা বোধহয় মেরেই ফেলবে। অন্যায় হচ্ছে আমার সঙ্গে। আমি বারবার ওকে বলছিলাম, তুই বাড়ি ফিরে আয়। ও বলল, ফিরছি।'' এরপরই ফোন কেটে যায়। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, অসমের গুহপুরের কাছে রেললাইনের কাছে পাওয়া গিয়েছে হিমাঙ্করের মৃতদেহ। নীতীশবাবুর অভিযোগ, "বাসযাত্রার সময় চালকের সঙ্গে ছেলের কোনও বিষয় নিয়ে বচসা হয়। এরপরই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে মারধর করে রেললাইনের ধারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি সরাসরি খুন।"
খবর পেয়েই কুর্শামারির ওই বাড়িতে গিয়েছিল জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের মুখপাত্র পার্থপ্রতিম রায় বলেন, "আবার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ থেকে ফেরার পথে অসমের গুহপুরের কাছাকাছি কোনও জায়গায় তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই ধরনের ঘটনা বারবার সামনে আসছে যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলা হচ্ছে, তাঁদের প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে। অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগের খবর। বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই ধরনের ঘটনাকে ধিক্কার জানাচ্ছি।"
নিহত হিমাঙ্কর পালের বাড়িতে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। নিজস্ব ছবি
এ প্রসঙ্গে বিজেপির শীতলকুচির বিধায়ক বরেণচন্দ্র বর্মন বলেন, ''যে কোনও মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক। তবে ওই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছে, সেটা না জেনেই এখান থেকে তৃণমূল শুধুমাত্র রাজনীতি করার জন্য এই ধরনের অভিযোগ আনছে। বাস্তব হচ্ছে, এই রাজ্যে কোনও কাজ নেই। তাই বিজেপি শাসিত রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে স্থানীয় বাসিন্দারা যেতে বাধ্য হতে হচ্ছেন।''
