দীপঙ্কর মণ্ডল: ইউরোপ আমেরিকায় স্কুলপড়ুয়াদের যৌনশিক্ষা দেওয়া হয়। একসময় রাজ্য সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিল। কিন্তু পাঠ্যক্রমে বিষয়টি চালু হয়নি। গোটা দেশের মত এ রাজ্যেও শিশুদের উপর যৌন হেনস্তার অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। স্কুলগুলিকে একটি নিয়মাবলী পাঠিয়েছে সরকার। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, ছাত্র-ছাত্রীদের বয়স অনুযায়ী তাদের ‘স্পর্শ শিক্ষা’ দেওয়া হোক। কোনটা স্নেহের হাত আর কোনটা কামনার, তা বুঝে নিক খুদেরা। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই ব্যবস্থার পোশাকি নাম ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’। কিন্তু সিলেবাসে না থাকায় স্কুলগুলিতে এখনও তা চালু হয়নি। নির্দেশিকা প্রকাশের পর কয়েকমাস পেরিয়েছে। শিক্ষকদের বক্তব্য, কোন ক্লাসে কোন বিষয়ের শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের ‘স্পর্শ শিক্ষা’ দেবেন, তা পরিস্কার নয়। এরফলে যৌনশিক্ষার প্রথমপাঠও জুটছে না পড়ুয়াদের।
শিক্ষক নেতা স্বপন মণ্ডলের বক্তব্য, “স্পর্শশিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক সমাজ উদ্বিগ্ন। কারও মাথায় বা পিঠের সঙ্গে অন্য কোথাও হাত দেওয়ার যে তফাৎ তা বোঝাতে গেলে অনেকসময় শিশুটিকে স্পর্শ করে বোঝাতে হয়। সেক্ষেত্রে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠতে পারে। সেই ভয়েই কোনও স্কুলে বিষয়টি চালু হয়নি।” একইসঙ্গে সরকারের নির্দেশিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্কারভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা হয়নি। স্বপনবাবু এ প্রসঙ্গে বলেন, “সরকার নির্দেশ পাঠিয়েই খালাস। তা কার্যকর করা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। এক্ষেত্রে জেলায় জেলায় কর্মশালা প্রয়োজন। তা নাহলে ছাত্রছাত্রীদের স্পর্শশিক্ষা একটি কষ্ট কল্পনা হয়ে থেকে যাবে।” গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যশিক্ষা পর্ষদ রাজ্যের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শকদের কাছে নয়া নির্দেশিকা পাঠানোর কাজ শুরু করে। স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের ১৮ দফা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলিকে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘নজরদারি কমিটি’ গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক, পুলিশ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি তৈরি হবে। দু’মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে সেই রিপোর্ট সরকারকে জানানোর কথা বলা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও কর্মীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্কুল চত্বরে জল জমে যাতে ডেঙ্গু বা ওই জাতীয় কোনও রোগের জীবাণু না ছড়ায় তা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মিড-ডে মিল খাওয়ার পর তা পড়ুয়াদের পরিবেশন করতে হবে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর থেকে পানীয় জল পরীক্ষা করার পর তা ছাত্র-ছাত্রীদের দেওয়া যাবে। সমাজে এখন ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতো অনলাইন গেম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও বাড়ছে সাইবার অপরাধ। এই ধরনের অপচেষ্টা রুখতেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। স্কুল শিক্ষা দপ্তরের প্রধান সচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা নির্দেশিকায় বলেছেন, প্রতিটি স্কুলে ছাত্র, ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মী ও বহিরাগতদের জন্য আলাদা শৌচালয় থাকবে। বাসচালক বা খালাসিরা স্কুল ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবেন না। সম্ভব হলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর কথা বলা হয়েছে। সেই ক্যামেরা কাজ করছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। নয়া কমিটি কোনও অভিযোগ পেলে পকসো আইনে মামলা রুজু করবে। স্থানীয় থানার পুলিশ অফিসারকে কমিটিতে রাখার কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কর্মশালায় প্রয়োজনে পুলিশকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে স্কুলগুলি। আঠারো দফা নির্দেশের মধ্যেই বয়স অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ শেখানোর কথা বলা হয়েছে। অভিভাবকদের বক্তব্যকে আরও জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতর। ইলেকট্রিক লাইন, পাখা, লাইট, টিউব লাইট, বাল্ব প্রভৃতি প্রতি মাসে পরীক্ষা করতে হবে। সরকারের ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ প্রকল্পও যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে পারে তাও নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
The post শিক্ষকদের উদ্বেগে শুরুই হয়নি স্পর্শশিক্ষা, অন্ধকারেই খুদে পড়ুয়ারা appeared first on Sangbad Pratidin.
