যত নষ্টের গোড়া ডিসিআর! নিজের নামে নকল ডিসিআর তৈরি করে ট্রাফিক নজরদারি এড়িয়ে পাথরবোঝাই ট্রাক চলে যেত এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। আর এই ডিসিআরকে খুঁটি করেই বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের বিশাল বেআইনি সাম্রাজ্যের ফুলেফেঁপে ওঠা। সেই ডিসিআর এবার অনলাইন মাধ্যমে নিয়ে এল প্রশাসন৷ শুক্রবার মহম্মদবাজার থানা এলাকার রায়পুর চেক গেটে এই ব্যবস্থা সূচনা করেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) শুভম আগরওয়াল, সাঁইথিয়ার বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা-সহ প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকরা। এবার থেকে শুধুমাত্র অনলাইনেই মিলবে ডিসিআর। দুর্নীতিমুক্ত পদ্ধতির লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ প্রশাসনের।
এ প্রসঙ্গে বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করেছে। তারই অঙ্গ হিসেবে এই পদ্ধতি চালু করা হল। এর ফলে পাথর থেকে রাজস্ব আদায় নিয়ে যে বিভিন্ন অভিযোগ উঠত, তার আর কোনও সম্ভাবনাই থাকবে না। ট্রাক মালিকরা সরাসরি অনলাইনে রাজ্য সরকারকে রাজস্ব দেবেন এবং সরাসরি রাজ্য সরকারের কাছ থেকেই অনলাইনে ডিসিআর টোকেন পাবেন। মাঝে আর কোনওরকম কর্মী, আধিকারিক বা স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের 'কাটমানি' দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার থেকে পাথর খাদানের প্রত্যেকটি চেক গেটে সরকারি আধিকারিকরা নির্দিষ্ট যন্ত্রে অনলাইন মাধ্যমে রাজস্বের টাকা নেবেন এবং সেই যন্ত্র থেকেই বেরিয়ে আসবে ডিসিআর। ফলের নগদ আর্থিক লেনদেনের বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকবে না। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থাকা আধিকারিকরা যদি অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেক্ষেত্রে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও প্রশাসনের নানা স্তরের আধিকারিকদের নেতৃত্বে চলবে নজরদারি।
টুলু মণ্ডলের রাজপ্রাসাদ, নিজস্ব ছবি
প্রসঙ্গত, মহম্মদবাজার-সহ গোটা বীরভূম জেলার বিভিন্ন পাথর খাদান থেকে পাথর তুলে সেগুলি সরবরাহের জন্য যখন ট্রাক চালকরা খাদান এলাকা থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন রাজ্য সরকারকে এই খনিজ সম্পদ পরিবহণ বাবদ একটি কর দিতে হয় ট্রাক মালিকদের। এর পোশাকি নাম ডিসিআর বা ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপ্ট। কিন্তু যতদিন সরকারিভাবে এই টাকা আদায় হত, ততদিন বহু ট্রাক মালিক সরকারি কর্মীদের অবহেলার সুযোগ নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যেতেন। সেই প্রবণতা আটকাতে ২০১৬ সালে এই ডিসিআর সংগ্রহের দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলায় সেই দায়িত্ব পান পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল। তারপরই তাঁর দেদার দুর্নীতি শুরু হয়।
সরকারি ডিসিআরে রাজস্ব তুলতে তুলতেই নকল ডিসিআর ছাপানোর পদ্ধতি বুঝে ফেলেন টুলু। শুরু হয় নকল ডিসিআর ব্যবহার করে দেদার রাজস্ব লুট। জানা যায়, প্রতি ১০০ টি ট্রাক পিছু মাত্র ১০ টি ট্রাকের রাজস্ব পৌঁছে যেত রাজ্য সরকারের ভাঁড়ারে, আর বাকি ৯০টি ট্রাকের রাজস্বের টাকা ঢুকত টুলুর পকেটে। তবে শুধু টুলু একা তা আত্মসাৎ করতেন না। টুলুর কাছে এই টাকা পৌঁছে যেত একেবারে নিচুতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছেও।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বদলেছে পরিস্থিতি। সরকার পরিবর্তনের পরের মাস থেকেই বীরভূম জেলা থেকে ডিসিআর বাবদ আয় বেড়েছে প্রায় ৩ গুণ। তা আরও বাড়বে বলেও দাবি করেছেন সিউড়ির বিধায়ক তথা রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে, বন্ধ হয়েছে টুলুর নকল ডিসিআরের ব্যবসা। টুলুর কর্মচারী ও আত্মীয়দের বাড়ি থেকে একের পর এক উদ্ধার হয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি, নগদ টাকা, সোনা এবং দুর্নীতির রাশি রাশি প্রমাণ। কিন্তু টুলুকে আটকানো গেলেও পাথর খাদান এলাকায় নকল ডিসিআর সম্পূর্ণ আটকানো যাচ্ছিল না। আগে যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতির আকার নিয়েছিল তা আটকে গেলেও নিয়মিত একটি দু'টি করে নকল ডিসিআরের অস্তিত্ব মিলছিল। এ বার সেই ঘটনার মূলেই আঘাত হানল সরকার।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার থেকে পাথর খাদানের প্রত্যেকটি চেক গেটে সরকারি আধিকারিকরা নির্দিষ্ট যন্ত্রে অনলাইন মাধ্যমে রাজস্বের টাকা নেবেন এবং সেই যন্ত্র থেকেই বেরিয়ে আসবে ডিসিআর। ফলের নগদ আর্থিক লেনদেনের বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনও সম্ভাবনাই থাকবে না। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থাকা আধিকারিকরা যদি অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেক্ষেত্রে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও প্রশাসনের নানা স্তরের আধিকারিকদের নেতৃত্বে চলবে নজরদারি। সেখানে এমন কোন ঘটনা যদি নজরে আসে তাহলে অভিযুক্ত ট্রাক মালিকের সঙ্গে সঙ্গেই চেক গেটের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক আধিকারিককেও রেয়াত করা হবে না।
