আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান প্রকল্পে মিলেছে রাস্তা৷ বসেছে পথবাতি৷ পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়েছে৷ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও শিশু শিক্ষাকেন্দ্র। রাজ্যের হাত ধরে পরিষেবা মিলতে পাল্টেছে শিলিগুড়ি মহকুমা নকশালবাড়ি ব্লকের মনিরাম, কেতুগাবুর, হাতিঘিসা, সাদামল্লিকজোত, কুচাইমল্লিক, নিহালজোতের মতো বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা ধীমালদের জীবনমান। তবে আক্ষেপ রয়েই গিয়েছে। বহুবার দরবারের পরও 'জনজাতি' স্বীকৃতির দাবি নিয়ে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক কোনও পদক্ষেপ করেননি। এমনকী উদাসীন দার্জিলিংয়ের সাংসদ।
গবেষকদের একাংশের মতে, আর্যদের আগমনের প্রায় ১ হাজার বছর পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব হিমালয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল ধীমালরা। হজসন, ডাল্টন, হান্টার, রিসলি এবং ও'ম্যালি ধীমালদের অনার্য উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ধীমাল জনজাতি অস্তিত্ব রক্ষা কল্যাণ সমিতির সম্পাদক, গর্জন মল্লিক জানান, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিজেপি বিধায়ক আনন্দময় বর্মন ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর এবার আবার এলাকায় প্রচারে এলে তাকে ফের ধীমালদের উপজাতি স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালে আশ্বাস দিয়েছিলেন। আশা ছিল কেন্দ্রে বিজেপি সরকার থাকায় উপজাতির স্বীকৃতির দাবি তিনি তুলে ধরবেন। কিন্তু করেননি৷ এবারও একই আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও দাবি পূরণ না-হওয়া পর্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না।
চাষের জমিতে তরুণীরা।
গর্জনবাবু বলেন, "আমরা প্রাচীন জনজাতি৷ অথচ সেই স্বীকৃতি মিলছে না। সেটা পেলে শিক্ষা থেকে চাকরি সবক্ষেত্রে সংরক্ষণ মিলবে৷ দীর্ঘদিন থেকে আমরা এই দাবি জানিয়ে আসছি৷" ধীমালদের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২ হাজার। ভোটার সংখ্যা প্রায় আটশো। এসআইআর-এ কিছু বাদ পড়েছে৷ কিছু নাম বিচারাধীন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কোনও সাহায্য মেলেনি। এমনকী জনজাতির স্বীকৃতির বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। তবে রাজ্যের বাংলার আবাস যোজনা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, কন্যাশ্রীর মতো বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে এলাকার ছবি পাল্টেছে৷ পাকা রাস্তা পেয়েছে গ্রাম৷ পথবাতি বসেছে৷ বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়েছে। তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও শিশুশিক্ষা কেন্দ্র।
ধীমালদের ভাষার নাম 'ভাটে বার্মেলি'। মানুষজন গ্রামে ওই ভাষায় কথা বলেন৷ আর তাঁদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম 'ঢাকা বোনা'। রয়েছে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ঢোল, উর্নি, চোঙ্গা, মেডং, খুলঢুলকা, ছিরঢুকিয়া, মোচুং৷ প্রিয় খাদ্য শুয়োরের মাংস। সঙ্গে ভাত পচিয়ে তৈরি পানীয় ইউ। ধীমালরা প্রকৃতির পূজারী। সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী। সম্প্রতি ধীমালরা রাজবংশী, কামতাপুরীর মতো প্রাথমিকে নিজস্ব ভাটে বার্মেলি ভাষায় পঠনপাঠনের সুযোগের দাবিতে সরব হয়েছে। ধীমাল জনজাতি অস্তিত্ব রক্ষা কল্যাণ সমিতির সম্পাদক মনে করেন, এটা হলে ভাষা সংরক্ষণের পাশাপাশি শিশুরা নিজেদের ভাষায় পড়ায় সুযোগ পাবে।
জনজাতির স্বীকৃতি মেলেনি পাহাড়ি ধীমালদের।
এছাড়াও উচ্চশিক্ষায় ধীমাল পড়ুয়াদের স্কলারশিপ দেওয়ার দাবি উঠেছে। তাদের অভিযোগ, উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে এলাকার ছেলেমেয়েরা শ্রমিকের কাজে চলে যাচ্ছে। সমস্যার কথা অস্বীকার করেননি মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মন। তিনি বলেন, "ধীমালদের সম্প্রদায়ের জনজাতির স্বীকৃতির দাবি অনেক দিনের ৷ এবার আমরা ক্ষমতায় এলে দাবি পূরণ করব ৷ স্বীকৃতির পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কাজও করব।" কিন্তু মুশকিল হয়েছে বিগত পাচ বছরের অভিজ্ঞতায় বিদায়ী বিধায়কের আশ্বাসে যে কেউ ভরসা রাখতে পারছেন না!
