এ যেন ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো! সত্যি তাই। অ্যাসবেস্টস-টালির ঘরে তিনটে ছোট ছোট রুম। আর সেই ছোট্ট ঘরেই স্বপ্নের জাল বুনতেন। একটা বাল্বের আলোয় পড়তে পড়তে ভাবতেন লেখাপড়া করে একদিন স্বনির্ভর হবেন। ঘরের অভাব দূর করে এলাকার শিক্ষার বিস্তার ঘটাবেন। এগিয়ে নিয়ে যাবেন নারীশিক্ষাকে। কারণ, তিনি নিজের চোখে দেখেছেন দিদি বিমলাকে স্রেফ অভাবের জন্য স্কুলছুট হতে। ক্লাস এইটেই ছেদ পড়ে গিয়েছিল তার লেখাপড়ায়। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে সেই অভাব প্রতিবন্ধক হয়নি কমলার লড়াইয়ে। ইউজিসি-র ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (নেট)-এ জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে এখন উজ্জ্বল জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার আদিবাসী তরুণী কমলা বেসরা। সঙ্গে মিলেছে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের যোগ্যতাও।
বনমহল পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের লক্ষণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম দেউলির বাসিন্দা তিনি। যে গ্রামে এখনও রাস্তা মসৃণ নয়। চারচাকার গাড়ি যায় বহু কষ্টে। স্বাভাবিকভাবেই নেই কোনও বাসরুট। ওই দেউলি গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া ৬০-এ জাতীয় সড়কে কুলগোড়া মোড় আসতে হয়। তারপরেই মেলে বাস। একদিকে অভাবের বাধা। অন্যদিকে প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিবন্ধকতা। আর তাকে সঙ্গী করেই সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যান এই আদিবাসী তরুণী। গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে হেঁটে কেশবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ নেন। তারপর ৫ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মণপুর হাইস্কুল। তখন অবশ্য একটা ভাঙা সাইকেল জুটেছিল। সেই সাইকেলেই যাওয়া আসা করে মাধ্যমিক পাশ।
বনমহল পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের লক্ষণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম দেউলির বাসিন্দা তিনি। যে গ্রামে এখনও রাস্তা মসৃণ নয়। চারচাকার গাড়ি যায় বহু কষ্টে। স্বাভাবিকভাবেই নেই কোনও বাসরুট। ওই দেউলি গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া ৬০-এ জাতীয় সড়কে কুলগোড়া মোড় আসতে হয়। তারপরেই মেলে বাস।
তারপর গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে শহর পুরুলিয়ার নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতক। সেখান থেকে সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মধ্যে কমলায় একমাত্র তরুণী যে এই উপজাতির মধ্যে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পান। এই সর্বভারতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তিনটি সুযোগ মেলে। পিএইচডি, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এছাড়া জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ ও সেই সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তৃতীয়টি সবচেয়ে বেশি কঠিন। আর সেটাই অর্জন করেছেন কমলা। কিন্তু
এই সাফল্যের পরেও মন ভালো নেই তার। কারণ তার মা অসুস্থ। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি। মায়ের অসুস্থতায় কমলাও যেন অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। রয়েছেন মায়ের কাছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেই ফোন ধরেননি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বউদি মিনতি বেসরা বলেন, "কমলা চায় না তাঁর এই সাফল্যের কথা প্রচারের আলোয় আসুক। সে শুধু নিজের কাজটুকু করতে চায়।" তাঁর জেঠতুতো দাদা নিখিল বেসরা শোনান, তার বোনের লড়াইয়ের কথা। অভাবকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। নিখিল বলেন, "বোনের জন্য তো সত্যি গর্ব হচ্ছে। এই জায়গায় পৌঁছতে ও কম কষ্ট করেনি।" এ কথা মানছেন সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান গৌতম মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, "একেবারে প্রান্তিক কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়ে স্রেফ অধ্যবসায় এবং জেদে তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। আমরা তাকে কুর্নিশ জানাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে উপজাতি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই স্বীকৃতি প্রথম।"
গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে শহর পুরুলিয়ার নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতক। সেখান থেকে সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মধ্যে কমলায় একমাত্র তরুণী যে এই উপজাতির মধ্যে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পান। এই সর্বভারতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তিনটি সুযোগ মেলে। পিএইচডি, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এছাড়া জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ ও সেই সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।
প্রাক্তনীর সাফল্যে খুশি প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসচিব গুরুদাস মণ্ডল। তিনি বলেন, "একেবারে প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে এসে সর্বভারতীয় স্তরে এই সাফল্যের পেছনে ওই প্রাক্তনীকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ওর লড়াইয়ের প্রশংসা করতেই হবে।" অজপাড়া গাঁয়ের গ্রামের টালির ঘর থেকে একেবারে গবেষণার গণ্ডিতে পা রাখলেন ওই আদিবাসী তরুণী। তাই সোশ্যাল সাইটে এখন ট্রেন্ডিং কমলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান বলছেন,"আর ওকে পিছন ফিরে তাকাতে হবে না।" অধ্যবসায় থাকলে যে সাফল্য আসবেই
এই বনমহলে যেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন কমলা।
