মাটি থেকে প্রায় ১৩ হাজার ফুট ওপরে উড়ছে একটি বিশেষ বিমান। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সেখান থেকে ঝাঁপ দিলেন এক তরুণী। চারপাশে শুধুই মেঘ আর অসীম আকাশ। নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে প্যারাশুট খুলে নিখুঁতভাবে মাটিতে অবতরণ। এ যেন সিনেমার দৃশ্য নয়, বাস্তবের এক সাহসী অভিযাত্রা। এই রোমাঞ্চকর খেলাটিই স্কাই ডাইভিং, আর সেই খেলাতেই নিজের নাম তুলে ধরেছেন উত্তরবঙ্গের মহিমা ছেত্রী। জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার ব্লকের ডামডিম বাজারের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মহিমাই এ রাজ্যের প্রথম নারী যিনি এই স্কাই ডাইভিংয়ে তুখোড় পারদর্শী।
স্কাই ডাইভিংয়ে পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্যে ছিল, সেখানে নিজের জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু সাহস, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাঁকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। মহিমার বাবা অর্জুন ছেত্রী সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে পরে আরপিএফ-এ কাজ করেছেন। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের ছেলেদের সমান সুযোগ দিয়েছেন তিনি। ডুয়ার্সের বাগরাকোট সেনা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, পরে শিলিগুড়ি সংলগ্ন দাদাপুরের একটি বেসরকারি আইন কলেজ থেকে আইন নিয়ে স্নাতক—সবকিছুই ছিল নিয়মমাফিক। কিন্তু মনের ভিতরে ছিল অন্যরকম কিছু করার তাগিদ। অনলাইনে আবেদন করে জাতীয় স্তরের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সুযোগ পান মহিমা।
মহারাষ্ট্রে রিলায়েন্স সিকিউরিটি রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সংস্থায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে বর্তমানে নাগুথালা পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারিতে সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত। তবে পেশার গণ্ডির বাইরে তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। সেই স্বপ্নপূরণে পাড়ি দেন থাইল্যান্ডে।
মহারাষ্ট্রে রিলায়েন্স সিকিউরিটি রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সংস্থায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে বর্তমানে নাগুথালা পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারিতে সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত। তবে পেশার গণ্ডির বাইরে তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। সেই স্বপ্নপূরণে পাড়ি দেন থাইল্যান্ডে। আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে স্কাই ডাইভিং প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘এ’ ক্যাটাগরির লাইসেন্স অর্জন করেন। দেশে ফিরে ‘স্কাইহাই ইন্ডিয়া’ সংস্থার মাধ্যমে দক্ষতা আরও শানিয়ে তোলেন। ইতিমধ্যে ৩০টি সফল জাম্প তাঁর ঝুলিতে। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
স্কাই ডাইভিং একটি ব্যয়সাপেক্ষ খেলা। প্রতিটি জাম্প, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। নিজের বেতন এবং ঋণের সাহায্যে এতদূর এগিয়ে এসেছেন মহিমা। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছাতে গেলে প্রয়োজন আরও বড় সহায়তা। মহিমার স্পষ্ট বক্তব্য, “স্বপ্নপূরণ করতে গেলে শুধু সাহস নয়, প্রয়োজন সহযোগিতা। সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলে আমি এক বছরের মধ্যে ৫০০ জাম্প সম্পন্ন করে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারব।” তাঁর লক্ষ্য, শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলা ও দেশের নাম বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। তাঁর আগে ভারতের মাত্র কয়েকজন নারী এই খেলায় সাফল্য পেয়েছেন। সেই তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়তে চান তিনি।
মহিমার এই লড়াইয়ে তাঁর পরিবারও সমানভাবে পাশে রয়েছে। মা রুমা ছেত্রী বলেন, “অনেক কষ্ট করে মেয়ে এতদূর এসেছে। যদি সরকার একটু সাহায্য করে, তাহলে ওর স্বপ্ন পূরণ হবে।” স্থানীয়দের বক্তব্য, যথাযথ সহযোগিতা পেলে এই তরুণী শুধু আকাশ ছোঁবেন না, বরং দেশের গর্ব হয়ে উঠবেন—এমনটাই আশাবাদ সকলের।
