লোনা জলের ঘেরাটোপ। চারদিকে সুন্দরবনের আদিম অরণ্য আর উত্তাল সমুদ্রের গর্জন। এক সময় এই দ্বীপ ছিল কার্যত বিচ্ছিন্ন এক ভূখণ্ড। উন্নয়নের আলো পৌঁছনো যেখানে ছিল দিবাস্বপ্ন। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুকে গত ৯৮ বছর ধরে এক চিলতে প্রদীপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফুলবাড়ী শীতলা হাইস্কুল। যে প্রদীপের শিখায় ললাট লিখন বদলে গিয়েছে সুন্দরবনের হাজার হাজার ঘরহারা, সহায়হীন শিশুর। অভাব আর প্রতিকূলতাকে জয় করে যারা আজ সমাজের মূল স্রোতে প্রতিষ্ঠিত। শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই প্রাচীন শিক্ষাতীর্থই ফের সাক্ষী থাকল এক আবেগঘন মাহেন্দ্রক্ষণের। উপলক্ষ ছিল, ২০২৬ সালের প্রাক্তনীদের পুনর্মিলনী উৎসব।
১৯২৮ সাল। যখন পরাধীন ভারতের বুকে শিক্ষার আলো পৌঁছনো ছিল এক কঠিন লড়াই। সেই সময়েই সাগরের মাটিতে এই বিদ্যালয়ের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ প্রায় এক শতাব্দী প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র একটি ইমারত নয়। বরং সুন্দরবনের কয়েক প্রজন্মের আবেগ আর উত্তরণের কাহিনি। বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এদিন পা রাখতেই যেন স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে এল ফেলে আসা দিনগুলো। পুরনো দিনের সেই বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড আর প্রিয় শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা।
এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা। উপস্থিত ছিলেন এলাকার বহু বিশিষ্ট গুণীজন। মন্ত্রী মহাশয় তাঁর বক্তব্যে বিদ্যালয়ের এই সুদীর্ঘ লড়াইয়ের কথা স্মরণ করেন। সুন্দরবনের মতো একটি ভৌগোলিক ভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় এই স্কুলটি কীভাবে শিক্ষার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে, তা উঠে আসে তাঁর কথায়। বর্তমান প্রধান শিক্ষক ভোলানাথ দাসের তত্ত্বাবধানে গোটা অনুষ্ঠানটি এক উৎসবের রূপ নেয়।
বর্তমানে এই বিদ্যালয়টি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত। আধুনিক ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে ডিজিটাল পরিকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই এটি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছে। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রাক্তনীরা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। কেউ আজ প্রশাসনিক কর্তা, কেউ চিকিৎসক, কেউ বা শিক্ষক। জীবনের বিভিন্ন বাঁকে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্বীকার করে নিলেন, এই ফুলবাড়ী শীতলা হাইস্কুল না থাকলে তাঁদের জীবন আজ অন্য খাতে বইত।
বিদ্যালয়ের নথিপত্র এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বলছে, এখান থেকে পাশ করা বহু পড়ুয়া আজ দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। শতবর্ষের ঠিক দু’পা আগে এই মিলনমেলা যেন সেই সাফল্যেরই উদযাপন। স্কুলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের রূপরেখা নিয়েও এদিন আলোচনা হল। অনুষ্ঠান শেষে পড়ন্ত বিকেলে যখন বিদায়ের সুর বাজল, তখন সবার চোখেমুখে ছিল একটাই তৃপ্তি— শতবর্ষের এই আলোকবর্তিকা এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দিশা দেখিয়ে যাবে।
