ইন্ডাস্ট্রি, রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন ও ‘কেউ বলে ডাকাত, কেউ বলে বিপ্লবী’ নিয়ে সাক্ষাৎকারে টোটা রায়চৌধুরি।
এই প্রথম জিতের সঙ্গে কাজ করলেন ‘কেউ বলে ডাকাত, কেউ বলে বিপ্লবী’ ছবিতে। এতটা সময় লাগল কেন?
এটা আমারও প্রশ্ন (হাসি)। বহুদিনের চেনাজানা। আমরা যে ধরনের অভিনেতা, একে অপরের কমপ্যাটেবল, ফিজিক্যালি বলো বা আমাদের কমার্শিয়াল স্কিলস বলো। কেউ সেরকম ভাবে ভাবলে হয়তো আমরা এর আগে কাজ করতে পারতাম, হয়ে ওঠেনি।
এটা পিরিয়ড ফিল্ম। আপনার চরিত্র ইন্সপেক্টর দুর্গাপ্রসাদ রায়। মূল আকর্ষণটা কোথায় ছিল?
ওই যুগটা আমাকে টানে। এগিয়ে যেতে গেলে আমাদের শিকড় সম্পর্কে আরও বেশি জ্ঞান অর্জন করতে হবে, তার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। বাঙালির অতীত আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে। দ্বিতীয়ত, চরিত্রটা খুব সুন্দর লেখা। সাধারণত একজন সুপারস্টারের ছবিতে অন্যান্য যে চরিত্রগুলো থাকে, খুব যে বলিষ্ঠ হয় বা জায়গা থাকে তা নয়। এখানে চিত্রনাট্যে সেই জায়গাটা ছিল। সেটা আমার আরও ভালো লেগেছিল। তাছাড়া জিতের সঙ্গে প্রথমবার কাজ করছি। আর যেটা দরকার, ফরওয়ার্ড থিংকিং একটা প্রোডাকশন হাউস। অনেকেই ছবি করছেন কিন্তু ছবিটা ঠিকমতো রিলিজ হচ্ছে না। আমার ক্ষেত্রে অনেকবার হয়েছে। কারণ প্রোডাকশন হাউসের সেই ভিশন বা প্যাশন ছিল না। নন্দী মুভিজের সেই প্যাশনটা আছে। ওদের সঙ্গে তো আমি আরও একটা কাজ করেছি। মনে হয়েছিল এই ধরনের ছবি ওরা ভালো করবে। জিতেরও সেই প্যাশন আছে।
নিজের চরিত্রের জন্য আলাদা প্রস্তুতি?
ছয়ের দশকের শেষ ভাগ বা সাতের দশকের শুরুর সময়টা ধরা হয়েছে ছবিতে। সেই সময়ের শরীরী ভাষা, কথা বলার ধরন অনেকটা আলাদা ছিল। আমি চাইনি আমার আধুনিক যে অভিব্যক্তি সেগুলো দিই। সেই কারণে ওই যুগের কয়েকটা ছবি দেখেছি।
এই সময়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক সমাগম কমেছে। স্বাধীনতা দিবসের সময় আপনাদের ছবিটা আসছে। ক্রমশ ওটিটি দেখার প্রবণতা বাড়ছে। সিনেমা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে? ওটিটি কি ভবিষ্যৎ?
সিনেমা বরাবর থেকে যাবে। আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে বসে আমরা একে অপরকে গল্প বলতাম। কালেক্টিভ ক্রিয়েটিভ ভিউয়িং-লিসনিং-এর অভ্যাস আমাদের ডিএনএ-তে। যেটা একমাত্র সিনেমা দিতে পারে। তবে ছবি হিট করানো এখন সমস্যার। কারণ খুব বড় মাপের ছবি না হলে মানুষ হল-এ যেতে চাইছে না। আমাদের সময়ে রাগ হলে, দুঃখ হলে বা খুব আনন্দ হলে সিনেমা দেখতাম আমরা। এখন প্ল্যান করে সিনেমা দেখা হয়। আর টিকিট মূল্য এবং আনুষঙ্গিক মিলিয়ে যে বড় খরচ হয় সেটাও একটা কারণ মানুষের হল-এ যেতে না চাওয়ার। আমি নিজে ওটিটি, সিনেমা দুটোই করব। যেটা হাতে নেই সেটা নিয়ে চিন্তা করব না। সৎ ভাবে সব কাজ করে যেতে চাই।
এখন আপনি ড্রিম রানের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। মাঝে স্তিমিত হয়েছিল। আবার গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী। আগামিদিনে বলিউডের কোনও প্রস্তাব পেয়েছেন?
না, একটা জিনিস পরিষ্কার বলে দিয়েছি, অকিঞ্চিৎকর চরিত্রে কাজ করব না। আমার বাংলাতে যা স্টেটাস তার কাছাকাছি যদি কিছু দিতে পারো তবে করব। যেহেতু তোমরা বড় ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু আমাকে ছোট কাজ দেবে, সেটা করব না। সে রকম হলে বছরে অন্তত একশো আশি দিন ওখানে কাজ করতে পারি।
সুজয় ঘোষের কলকাতায় শুটিং করার কথা। এর মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে?
না, যোগাযোগ হয়নি। আর কাজের যা অবস্থা ডিসেম্বর শেষ পর্যন্ত আমার কোনও ডেট নেই।
কীরকম?
সৃজিতের ছবিটা (কানাইচরণ) শুরু হবে। ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ রিলিজ করবে। সেপ্টেম্বরে ‘ফেলুদার’ শুটিং। অক্টোবরে অনুপম খেরের কাজের শুটিং রয়েছে। নভেম্বরের শেষে একটা কাজের কথা চলছে। ডিসেম্বরে দক্ষিণী ছবির একটা কাজ রয়েছে। মাঝে মাঝে বম্বের কিছু ডাবিং আর পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলবে। ফলে সময় নেই। এখন হঠাৎ করে আবার দেখছি কাজের জোয়ার আসছে।
সম্প্রতি নিট ইস্যুতে জিৎ ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। আপনার কী বক্তব্য? (এই সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পরেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার খবর আসে।)
যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ ছাত্রদের সমর্থন করবেন। আবার আমরা দেখেছি বহু মানুষ এই ছাত্র আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেছেন, সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃত ছাত্রদের দাবি আমি সমর্থন করি। এটা বেসিক ফান্ডামেন্টাল দাবি। প্রকৃত ছাত্রদের পরিষ্কার হিসেব, যে আমি আমার মেধার পরিচয় দেওয়ার জন্য একটি স্বচ্ছ ত্রুটিমুক্ত পরীক্ষামূলক বৃত্তির মধ্যে যেন বসতে পারি। বেশ কয়েকটা কম্পিটিটিভ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফঁাস হয়ে গিয়েছে। একই সময়ে ছাত্রদের হয়ে অনেকে অনেক কিছু দাবি করছেন। যেটা হয়তো ছাত্রদের নয়। অনেককে দেখেছি এই ইস্যুতে নীরব। তাঁরা ছবি মুক্তির সময় বলেন জনতাই সব অথচ জনতার ইস্যুতে নিশ্চুপ। সারা পৃথিবীতে দেখেছ, এখন কেউ আওয়াজ তুললে তাকে কীভাবে দমিয়ে রাখা হয়! বিশেষ করে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যদি আওয়াজ তোলেন তঁাকে কীভাবে দমন করতে হয় সেটা শক্তিধরদের সিদ্ধহস্ত। অনেকেই ভাবে, এটা তো আমার জীবিকা। আমার পেটে যদি অন্ন না পড়ে আমার হয়ে কে লড়বে। এটা তঁাদের ভীরুতা নয়, সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট। আমাদের মতো নির্বোধরা মুখ খুলি।
একজন শিল্পীর কি সক্রিয় রাজনীতিতে থাকার প্রয়োজন আছে?
আমার কাছে শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নিরপেক্ষতা। কিন্তু শিল্পী তো সমাজেরই একটা অংশ। আশেপাশে যদি অন্যায় ঘটে আমি তো অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র হয়ে থাকতে পারি না। আমার কাজ শিল্পী হিসাবে সব বিশ্বাসের মানুষকে একত্রিত করা, বিভাজিত করা নয়। রাজনীতি কিন্তু বিভাজন করে।
পালাবদলের পর আপনার কী প্রতিক্রিয়া?
পালাবদলটা তো রাজনৈতিক। যে কোনও পরিবর্তনের পর অন্তত এক হাজার দিন দিতে হয়। না হলে আমরা বুঝতে পারব না, সঠিক হয়েছে, কি হয়নি। আরও কয়েকশো দিন দেখি তারপরে বলতে পারব। গত কয়েক বছর ধরে আমরা যে ভুল করে যাচ্ছি, যে একটা সার্বিক রাজনীতিকরণ হয়েছে, এতে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি হয়েছে। মানুষজন আমাদের আর সেইরকম সিরিয়াসলি নেয় না। যে এরা তো রাজনীতি করে, অভিনয়টা কখন করে! এরকম কথা আমাকে বহুবার শুনতে হয়েছে। আশা করি সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।
