একটা সফল ছবির সিক্যুয়েল আনা শক্ত। নয়ের দশকে যাঁদের বেড়ে ওঠা তাঁরা ‘হাওয়া বদল’ ছবিটা পছন্দ করেছিলেন। ফ্যান্টাসি-কমেডির নিপুণ বুনটে সে ছবি এখনও মনে রয়ে গিয়েছে। পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় তার সিক্যুয়েল নিয়ে এলেন ১৩ বছর পরে। নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ। কারণ, এত বছরের ব্যবধানে চরিত্রদের বয়স যেমন বেড়েছে, প্রেক্ষিতও বদলে গিয়েছে। পাভেলের লেখা কাহিনি-চিত্রনাট্যে ফিরে আসছে ছোটবেলার দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু– জিৎ (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) এবং রাজের (রুদ্রনীল ঘোষ) যৌথ জীবনযাপন। সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষিতে রুদ্রনীল-পরমব্রত একসঙ্গে স্ক্রিনে এলেই পর্দায় আলাদা তরঙ্গ! তার ওপর এবারের গল্পেও পাল্টা-পাল্টির খেলা অর্থাৎ ‘সোল সোয়্যাপিং’।
কিন্তু এবারে বিষয়টা তুলনায় সিরিয়াস। এক বন্ধু বলে–আমার জীবনটা তুই বাঁচ, তোর মরে যাওয়া আমি নিই! এমন কি হয় এই যুগে? যতই চরিত্রের মুখে ‘গভর্নমেন্ট চেঞ্জ, ওয়েদার চেঞ্জ’-এর মতো সংলাপ থাকুক, এই ছবি খাদহীন বন্ধুত্বের সফরনামা। প্রথম ছবিতে একজন সাফল্য কাকে বলে জানতই না, অন্যজন তুলনায় সফল, সংসারী আর্কিটেক্ট। দ্বিতীয় ছবিতে লন্ডনের মাটিতে হঠাৎ দেখা হচ্ছে হরিহর-আত্মা দুই বন্ধুর। এনআরআই জিৎ (পরমব্রত) সেখানে থাকে, হোটেলে কাজ করে। বউ তনুকার (রাইমা সেন) সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে, রয়েছে তাদের জেনজি ছেলে তোজো (কবীর ভট্টাচার্য)।
পরমব্রত
অন্যদিকে রাজ (রুদ্রনীল) এখন প্রতিষ্ঠিত রকস্টার। বিদেশেও তার বিপুল ফ্যানবেস। রয়েছে তার বান্ধবী কাজললতা (অনুষা বিশ্বনাথন) আর ম্যানেজার জয়ন্তদা (চঞ্চল ঘোষ)। খ্যাতির শিখরে যখন রাজ, জিতের জীবনের ছন্দ কেটে গিয়েছে। অসৎ পথে হোটেল ব্যবসা করতে গিয়ে জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছে সে। পুরনো বন্ধুকে কাছে পেয়ে অকপটে বলে সব কথা। এবং অনিবার্য পরিস্থিতিতে আত্মা বদলের খেলায় জড়িয়ে যায় তারা। কীভাবে? এবং কী কী হয় দেখার জন্য ছবিটা দেখতে হয়। আগের ছবিটা দেখা থাকলে নতুন ছবিটা খানিকটা প্রেডিক্টেবল লাগবে। তবে রুদ্রনীল-পরমব্রতর অভিনয়ের গুণে শেষ পর্যন্ত দেখা হয়ে যায়।
আবার হাওয়া বদল
প্রথমার্ধ দুই বন্ধুর সংকটের প্রেক্ষিত তৈরিতে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধ তুলনায় গতিশীল। হাল্কা মজার ছলে গল্প বলা হলেও, জীবনের অনিশ্চয়তার কথা বলে এই ছবি। পার্থিব সাফল্য কখনও জীবনের শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না– খুব স্পষ্ট করে বলা এই ছবিতে। আসল প্রাপ্তি ভালোবাসায়, বন্ধুত্বে। গল্প আর বিশদে বলছি না। ছবির জোরের জায়গা অভিনয়। চিত্রনাট্যে লন্ডনের আকাশ মাঝে মাঝে মেঘলা হলেও রুদ্রনীল-পরমব্রতর অন স্ক্রিন রসায়ন রৌদ্রোজ্জ্বল।
'আবার হাওয়া বদল'-এর দৃশ্য
দুটি চরিত্রের বিবর্তন ভালো ধরেছেন দুজনেই। তবে রকস্টার রুদ্রর তুলনায় সহজ বাল্যবন্ধু রুদ্র নির্দ্বিধায় বেশি মন ছুঁয়ে যাবে। বাদল দিনে তাঁর আর পরমব্রতর একটা গভীর আলিঙ্গন অনেকদিন মনে থেকে যাবে। আশা করা যায় এরপর রুদ্রনীলকে আরও অনেক ছবিতে পাওয়া যাবে। তনুকার চরিত্রে, রাইমার খুব বেশি কিছু করার ছিল না যতটুকু আছেন মানানসই। বেশ ভালো লাগে অনুষা বিশ্বনাথনকে। পাঙ্ক রকস্টার কিন্তু হৃদয়ে বাঙালি– দারুণ পারফরম্যান্স তাঁর।
বৃষ্টিভেজা রোম্যান্স!
ম্যানেজারের চরিত্রে চঞ্চল ঘোষ বড্ড চড়া। ওসমান ভাইয়ের ক্যামিও চরিত্রে চমকে দিলেন অরিত্র সেন। প্রসেনজিৎ চৌধুরীর ক্যামেরা ঠিকঠাক। চিত্রনাট্য আরও মুচমুচে হতে পারত। ছবির গান আলাদা করে মনে দাগ কাটে না। ছবির দৈর্ঘ্য কম হলে ভালো হত। শেষটা অতি দীর্ঘায়ত লাগে। প্রথম ছবিটা এখনও এগিয়ে থাকবে, তবে সব মিলিয়ে ‘আবার হাওয়া বদল’ নস্টালজিয়া আর পুরনো বন্ধুত্বের টানে দেখতে ভালো লাগে।
