- তুমি কে? পিটার পার্কার? নাকি স্পাইডারম্যান?
- দু'জনই আমি।
ছবির একদম ক্লাইম্যাক্সের এই সংলাপে বৃহস্পতিবাসরীয় দুপুরের হাউসফুল সিনেমা হল গর্জে উঠল হাততালি, সিটি ও হর্ষধ্বনিতে। ছবিটা নিয়ে লিখতে বসে এই দৃশ্যটার কথাই সবার আগে মনে পড়ল। টম হল্যান্ডের এই ছবির আসল কথা বোধহয় এটাই। ‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপন্সিবিলিটি।’ মাকড়সা-মানুষের এই বিখ্যাত সংলাপকে মাথায় রেখেই বলা যায়, অতিমানবীয় শক্তি নাকি ব্যক্তিপরিচয়, কোনটা যে সুপারহিরোর আসল সত্তা সেটাই যেন খুঁজতে চেয়েছে ছবিটি। টম হল্যান্ড অভিনীত ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে 'পার্সোনাল' ছবি বোধহয় এটাই। সবচেয়ে আবেগঘনও। সবচেয়ে সেরাও কি?
ছবির একদম শুরুতে আমরা পিটার পার্কারকে দেখি সেই পরিস্থিতিতে, যেখানে শেষ হয়েছিল 'স্পাইডারম্যান: নো ওয়ে হোম'। সকলে ভুলে গিয়েছে পিটারকে। আন্ট মে-র কবরে ফুল দিয়ে এসে সে লেগে পড়ে দৈনন্দিন কাজে। সেই কাজ- আমরা জানি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। নিউ ইয়র্কের মধ্যবয়সি মহিলা পুলিশ অফিসারের সঙ্গেও তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বটে। তবে সেখানেও স্রেফ কাজেরই কথা। মহিলা তাকে উপদেশ দেন, ''সব সময় কাজ-কাজ কোরো না! মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রামও নিতে হয়।'' কিন্তু কে শোনে কার কথা। কাজে বুঁদ স্পাইডিকে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, ''মুখোশ, মুখোশ, তোমার মন নাই পিটার?''
এর মধ্যেই শহরে এসে পড়ে এক নতুন শত্রু। কিন্তু সে অভিনব। অতিকায় দানবসদৃশ কেউ নয়। বলা যায়, তাকে কেউ চোখেই দেখেনি। কিন্তু সেই শত্রুই নাজেহাল করে তোলে প্রশাসনকে। পিটারকেও। এদিকে পিটার নিজের শরীরের মধ্যেও অনুভব করছে এক পরিবর্তন। কোথায় যেন সুরে সুর মিলছে না। নিজের শরীর, নিজের সত্তাই তার কাছে অপরিচিত ঠেকছে। ফলে একদিকে যেমন নতুন বিপদের মোকাবিলা, অন্যদিকে নিজের শরীরের সঙ্গে যুঝে উঠতে চায় সে।
এদিকে এমজে। সে এখন অন্যের বক্ষলগ্না। পিটারের সামনেই প্রেমিকের ওষ্ঠে সে এঁকে দেয় ভালোবাসার নিশান। বন্ধু নেডের সোশাল মিডিয়ার লাইভ দেখেই সন্তুষ্ট থাকে পিটার। এরা কেউই চেনে না তাকে। কেননা 'তার ছিঁড়ে গেছে কবে'! তবু পরিচয় হয়। কিন্তু তারপর?
অতিমানবীয় শক্তি নাকি ব্যক্তিপরিচয়, কোনটা যে সুপারহিরোর আসল সত্তা সেটাই যেন খুঁজতে চেয়েছে ছবিটি। টম হল্যান্ড অভিনীত ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে 'পার্সোনাল' ছবি বোধহয় এটাই। সবচেয়ে আবেগঘনও।
এতগুলো দিক একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে গল্প। মাঝে মাঝেই দুরন্ত অ্যাকশন। ভর্তি হলে হাততালি। মূলত জেন জি। কেবলই কি নব্য প্রজন্ম? আরও কচি ছেলেপুলেকে নিয়ে মা-বাবাও সপ্তাহের কেজো দিনে দিব্যি হলমুখী হয়েছেন। কিন্তু অন্য চেনা সুপারহিরো মুভির তুলনায় এই ছবি কেবলই অ্যাকশন আর জমকালো থ্রিলের মধ্যে আটকে থাকে না। যে ছবির খলনায়ক, তার শত্রুতার নেপথ্যেও রয়েছে আত্মজনকে ঘিরে থাকা বিষাদ।
ট্রেলার থেকে সকলেই জানেন এই ছবিতে রয়েছে মার্ভেলের অ্যান্টিহিরো পানিশার। মার্ভেলের ব্রহ্মাণ্ডে এই প্রথম সে পা রাখল। জন বার্নথল অভিনীত এই চরিত্রটি ইতিমধ্যেই নেটফ্লিক্সের শো ‘পানিশার অ্যান্ড ডেয়ারডেভিল’-এর মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়। জন এখানেও মাতিয়ে দিয়েছেন। রয়েছে হাল্ক, স্করপিয়ন আরও অনেকে। টম হল্যান্ড এখন অনেক পরিণত। জেন্ডায়াও চমৎকার। মার্ভেলের অন্যান্য ছবিতে যেমন অ্যাকশন-কমেডির দুরন্ত মিশেল থাকে, সেসব এখানেও আছে। কিছু দৃশ্যে গোটা হল হাসিতে ফেটে পড়ে। আবার হাল্কের দাপাদাপি, শূন্যে লাফ দেওয়া স্পাইডারম্যান দেখে উল্লাসের ধ্বনিতেও গমগম করে চারপাশ। তবে একথা বলতেই হয়, 'নো ওয়ে হোম'-এ তিন স্পাইডারম্যান বনাম তিন ভিলেনের দ্বৈরথে যে মজা ছিল এই ছবিতে সেটা অনুপস্থিত। রয়েছে একেবারে অন্যরকম কাহিনি বয়ন। স্রেফ চোখধাঁধানো গ্রাফিক্স ও চমৎকার এডিটিং, ভিএফএক্সের ঝলকানি নয়, সম্পর্কের তীব্রতাকেই যেন এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই ক্লাইম্যাক্সে অ্যাকশনের সমান্তরালে থেকে যায় আপনজনকে হারানোর বিষাদ কিংবা ফিরে পাওয়ার আকুতিও।
এমজে। সে এখন অন্যের বক্ষলগ্না। পিটারের সামনেই প্রেমিকের ওষ্ঠে সে এঁকে দেয় ভালোবাসার নিশান। বন্ধু নেডের সোশাল মিডিয়ার লাইভ দেখেই সন্তুষ্ট থাকে পিটার। এরা কেউই চেনে না তাকে। কেননা 'তার ছিঁড়ে গেছে কবে'!
এখানেই ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন পরিচালিত ছবিটি অনন্য। টম হল্যান্ড অভিনীত ট্রিলজি ছবিগুলি পরিচালনা করেছিলেন জন ওয়াটস। ক্রেটন স্বাদটা একটু বদলে দিয়েছেন। আসলে কাহিনিকারও এখানে নতুন। সেই কারণেই এমসিইউ-এর ছবিটি একদম অন্য সুরে বাজে। মুখোশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূ্র্ণ মুখোশের আড়ালে থাকা মুখটাও- সেই কথাটাই যে এই ছবির প্রাণভোমরা, তা বলা হয়েছে শুরুতেই। প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলেও মুখোশ-মানুষ হয়তো নিজের কাজটা ঘাড় গুঁজে করে যায়, তবু দিনের শেষে সম্পর্কের উষ্ণতা তারও প্রয়োজন। কেননা, অতি-ক্ষমতা যতই থাক, সে আসলে আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। পিটার পার্কার আর স্পাইডারম্যান তাই মিলেমিশে যায়। মিশিয়ে দেয় এই ছবি।
