বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে সমস্যার অন্ত নেই। টেকনিশিয়ান বনাম পরিচালক-প্রযোজক দ্বন্দ্ব, শুটিংয়ে নিরাপত্তার অভাব, শহরের বাইরে শুটিংয়ে কতজন টেকনিশিয়ান যাবেন এমন নানাবিধ সমস্যায় বহুবার অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুটিং। বকেয়া টাকা নিয়েও ভুক্তভোগী কলাকুশলীরা। এছাড়াও স্বজনপোষণ, দুর্নীতি তো ছিলই। বিগত একদশকে টলিগঞ্জের সিনেপাড়ার এই চিত্রটা সকলেরই চেনা। বহুবার ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছে। জল গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। বদলের বঙ্গে সিনেপাড়াকে সমস্যামুক্ত করতে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে রাজ্য সরকার। আসছে 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম অ্যান্ড শুটিং পলিসি।' যেখানে '১৮ দফা'র উল্লেখ রয়েছে।
টেকনিশিয়ানদের প্রাপ্য টাকা আটকে রাখলে দোষী প্রযোজককে 'ব্ল্যাকলিস্ট' করা হবে। প্রযোজকদের জন্য তৈরি হবে 'এসওপি'। কর্মক্ষেত্রে আচরণের দিকে বিশেযষ নজর দেওয়া হবে। বকেয়া বা কম টাকা দেওয়ার অভিযোগে নজর থাকবে রাজ্য সরকারের৷ বেতন সংক্রান্ত সমস্যা দূরীকরণে বেঁধে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম। রাতের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বাড়ি ফেরার জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়ার বিষয়টি সহজ করার জন্য উদ্যোগ নেবে রাজ্য সরকার। বিভিন্ন দফতরের অনুমতি এক ছাতার তলায় আনতে 'সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম'-এর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। টেকনিশিয়ানদের তৈরি হবে 'ডিজিটাল ম্যানপাওয়ার ডেটাবেস।' ফেডারেশন পুনরায় চালু করতে 'ওয়ার্কিং কমিটি' গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে।
গিল্ডের পরিষেবার জন্য আসতে পারে নতুন মোবাইল অ্যাপ। তরুণ ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রোডাকশন পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ সহজ করার ভাবনাচিন্তাও এই '১৮ দফা'র অন্তর্গত। বিদেশেও বাংলা ছবির বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। টেকনিশিয়ানদের স্বাস্থ্যবিমা ও শিল্পী-টেকনিশিয়ানদের পিএফের আওতায় আনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখবে নতুন সরকার। প্রযোজকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পৃথক 'প্রোডিউসরস অ্যাসোসিয়েশন' গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কী কী রয়েছে '১৮ দফা'য়।
১. ফেডারেশন অফিস চালুর সম্ভবনা: নতুন করে ফেডারেশন অফিস চালু করার বিষয়টি দেখবে রাজ্য সরকার। 'ওয়ার্কিং কমিটি' গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে।
২. টেকনিশিয়ানদের বেতন সুরক্ষা: টেকনিশিয়ানদের প্রাপ্য টাকা আটকে রাখলে দোষী প্রযোজককে 'ব্ল্যাকলিস্ট' করা হবে। বেতন আটকে রাখা লাইন প্রোডিউসারদের চিহ্নিত করবে গিল্ড।
৩. প্রযোজকদের জন্য নতুন এসওপি: কর্মক্ষেত্রে রুচিশীল আচারণ ও প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্টে তৈরি হবে 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর।' নির্দিষ্ট সময়ে বেতন থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া, রাতে শুটিং শেষে বাড়ি ফেরায় নিরাপত্তা সবকিছু উল্লেখ থাকবে নতুন এসওপিতে।.
৪. টেকনিশিয়ানদের সুবিধা: মাঝরাতে শুটিং শেষ হলে পরিবহণের ব্যবস্থা, মধ্যাহ্নভোজ থেকে নৈশভোজ, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
৫. প্রযোজক-গিল্ডের মধ্যে মউ (MOU): উভয় পক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করতে পারস্পরিক সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৬. বাংলা সিনেমার প্রদর্শন বৃদ্ধি: ৩০-৪০টি হলে ছবি দেখানোর জন্য প্রযোজকদের প্রায় ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি অডিটোরিয়াম ও প্রেক্ষাগৃহে নিয়মিত বাংলা ছবি প্রদর্শনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে রাজ্য।
৭. স্টুডিওর ভাড়ায় স্বচ্ছতা: ভাড়ার বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা আনতে পৃথক বৈঠক করবে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
৮. ডিজিটাল চার্জেও নিয়ন্ত্রণের ভাবনা: ডিজিটাইজেশন সংক্রান্ত খরচ ও ডিজিটাল চার্জ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে পৃথক বৈঠক করে উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সুপারিশ করা হবে।
৯. রাজ্যের নিজস্ব শুটিং পলিসি: সমস্ত পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তৈরি হবে পূর্ণাঙ্গ 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম অ্যান্ড শুটিং পলিসি।'
১০. শুটিংয়ের অনুমতিতে 'সিঙ্গল উইন্ডো': বিভিন্ন দফতরের অনুমতি এক ছাতার তলায় আনতে 'সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম'-এর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
১১. টলিউডে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স: টেকনিশিয়ানদের 'ডিজিটাল ম্যানপাওয়ার ডেটাবেস', অনলাইন গিল্ড পরিষেবা, অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গিল্ড সদস্যপদ-সহ বিভিন্ন পরিষেবার জন্য মোবাইল অ্যাপ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।
১২. সমস্যা মেটাতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা: কোনও সমস্যা আদালত বা প্রকাশ্য সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছনোর আগেই আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা।
১৩. বাংলা সিনেমার বাজার সম্প্রসারণ: বিদেশেও বাংলা ছবির বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
১৪. তরুণ ও স্বাধীন পরিচালকদের সুযোগ: নতুন ও স্বাধীন পরিচালকদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং সিনেমা তৈরির পরিকাঠামোয় সহজে সুযোগ পাওয়ার ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও রয়েছে।
১৫. স্বাস্থ্যবিমা ও পিএফের চিন্তাভাবনা: টেকনিশিয়ানদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার জন্য আয়ুষ্মান ভারত বা উপযুক্ত অন্য কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা তাঁদের দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। সেই সঙ্গে পিএফের বিষয়টিও ভাবনাচিন্তার স্তরে রয়েছে।
১৬. টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ: উন্নত প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
১৭. এফআইআর নিয়ে প্রস্তাব: গিল্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আইনি পদক্ষেপের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয় ফেডারেশন বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আলোচনায় আনার প্রস্তাব গিল্ডের সদস্যাদের।
১৮. পৃথক প্রোডিউসরস অ্যাসোসিয়েশন: প্রযোজকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পৃথক 'প্রোডিউসরস অ্যাসোসিয়েশন' গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
