‘হোক কলরব’ শুনলেই ছাত্র রাজনীতি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। এই ছবির নামের নেপথ্যেও তাই?
... একদম তাই। যেহেতু গল্পটা ছাত্রদের নিয়ে এবং এটা অ্যান্টি র্যাগিং সিনেমা। সিনেমার মধ্যে একটা আন্দোলন আছে। ২০১৪ সালে ‘হোক কলরব’-এর আবির্ভাব হয়, ছাত্রদের মধ্যে থেকে। মূল উৎপত্তি ছিল বাংলাদেশের গায়ক অর্ণবের গান। এই নামটা ক্যাচি। অর্থাৎ মন খুলে বলো, শোরগোল হোক। মনে হল, সিনেমার জন্য এই নামটা ঠিক হবে।
রাজনীতি ঘেঁষা ছবি করা তো ঝুঁকির। আপনি শুধুই পরিচালক নন, একজন এমএল-এ।
...আমি রাজনৈতিক ছবি বানাইনি। ‘হোক কলরব’ মানেই রাজনীতি নয়। যে কোনও ভালো উদ্দেশ্যেই এই শব্দটা ব্যবহার করতে পারি। আমি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই মুহূর্তে পলিটিক্যাল ছবি করতে পারব না। রাজনৈতিক ছবি করলে আমি আমার দলের প্রতিই বায়াসড হব। তখন জাস্টিফাই করতে পারব না, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। আমি সিনেমা বানানোর জন্য এত পরিশ্রম করেছি। সে ক্ষেত্রে যদি কোনওদিন পলিটিক্যাল ছবি করতে চাই, রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে করব। এই ছবিটা ছাত্রছাত্রীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে সিনেমা। ছাত্রাবস্থায় দুটো জিনিস কাজ করে, একটা গুড থিংস, অন্যটা ব্যাড থিংস। র্যাগিং সব জায়গায় হয়। যবে থেকে জ্ঞান হয়েছে, তবে থেকে শুনছি র্যাগিং। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল কলেজের ক্ষেত্রে, ইউনিভার্সিটিতে এই বিষয়টা শুনতাম। খুব সম্প্রতিও শুনেছি, র্যাগিংয়ের জন্য কত মানুষের প্রাণ গিয়েছে। কিন্তু একদিনের জন্য শোরগোল উঠে আবার থেমে গিয়েছে। মানুষ অন্য বিষয় নিয়ে মেতে উঠেছে। অথচ একটা অন্যায় হয়েছে সেই বিষয়ে সেই ভাবে প্রতিবাদ হয়নি। কাজেই সব দিক থেকে ‘হোক কলরব’ কথাটা বলতে পারি। এই গল্পটা দু’বছর আগে লেখা। আমি এখন যেমন ছবি করি তার মধ্যে মেসেজ থাকলে ভালো। সেটা ভেবেই করা।
প্রযোজক পাচ্ছিলেন না বলছিলেন।
... সবাই ব্যাক আউট করছিল। কিন্তু মনে হচ্ছিল ছবিটা করব। আমার টিমকেও বললাম, তবে সবাই বলছিল, টাকাটা জলে যাবে। ইতিমধ্যে ‘বাবলি’-তে অনেকটা টাকা চলে গেছে। কারণ, প্রথম দু’দিন ভালো কালেকশন ছিল, তারপর নয়। সেই সময় আর জি কর-এর ঘটনা ঘটেছিল। এবং ‘বয়কট বাবলি’ হাওয়া উঠেছিল, যেহেতু আমি নির্দিষ্ট দলের এমএলএ। আবার সেই দর্শকই ওই সময় ‘স্ত্রী টু’ দেখতে গেছে এবং সিনেমা দেখে আনন্দ করে খেতে গেছে, এও দেখেছি। তাই এক্ষেত্রে টিম আমাকে ঝুঁকি নিতে বারণ করেছিল, যে সবাই ব্যাকবাইটিং করবে। বলেছিলাম, জীবন একটাই। লোক দেখুক, না দেখুক, ছবিটা আমি বানাবই। তখন শুভশ্রী আমার মনের ভাব বুঝে বলে, ‘তুমি করো। যা হবে আমরা সাপোর্ট করব।’
শুভশ্রী আর আপনি যৌথ প্রযোজনায়।
... হ্যাঁ, অ্যাকচুয়ালি বাড়ির লক্ষ্মীর নামেই সব হওয়া উচিত। আমি আর শুভশ্রী আলাদা না। দুজন মিলেই একজন মানুষ। রাজ চক্রবর্তী এন্টারটেনমেন্টের ওয়ান অফ দ্য ডিরেক্টর শুভশ্রী। প্রযোজক হিসেবে সব সাইন ও করে। সেটা আমাদের জন্য লাকি।
ছবি: সোশাল মিডিয়া
ছবির একটা সংলাপ নিয়ে বিতর্ক হয়। ক্ষুদিরাম বসুকে অপমানের অভিযোগে। সেই লাইনটা বাদ দিয়েছেন। ব্যাকআউট কেন করলেন?
...এত কিছু মাথায় রেখে করিনি। আমরা বাঙালিরা শব্দ নিয়ে জাগলিং করতে ভালোবাসি। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমরা ক্ষুদিরামকে ঝুলিয়েছ অন্যায়ভাবে। তবে আমি এবার ঝোলাব। সেই ন্যারেটিভটা পালটে দেওয়া হল। বাজে বিতর্ক হল। তখন ভেবে দেখলাম চারটে লোকেরও যদি খারাপ লেগে থাকে, বাদ দিই।
শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় কি আপনার লাকি চার্ম?
... অবভিয়াসলি। অপুদার সঙ্গে কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে। ‘প্রলয়’ করার পরেই খুব চাহিদা ছিল। তারপর ওয়েব সিরিজ ‘প্রলয় টু’ করি। কিন্তু ওই ফ্র্যাঞ্চাইজিটা আমার না। তাই মনে হল, ‘প্রলয়’-এর মতো একটা ফিল্ম করতে গেলে অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি করতে হবে। তাই আমি অপুদাকে নিয়ে এটা করলাম।
ছবি: সোশাল মিডিয়া
তার মানে ‘হোক কলরব’ কি ফ্র্যাঞ্জাইজি হতে চলেছে?
...ছবিটা যদি ওয়ার্ক করে অপুদার ক্যারেক্টারটা ফ্র্যাঞ্চাইজি হবে। এগিয়ে নিয়ে যাব ‘ক্ষুদিরাম চাকী’-কে। তাহলে এই চরিত্রটা অন্য জায়গায় সমস্যা সমাধান করতে যেতে পারে।
দেব-শুভশ্রীর রিইউনিয়নে কী প্রতিক্রিয়া?
...আমি খুবই খুশি। ওদের জুটি যদি কমার্শিয়াল ছবিকে আরও বেটার জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, তার থেকে ভালো আর কিছু হবে না। আমরা পেশাদার। মানুষের মাথায় যেগুলো চলে, তার থেকে দূরে চলে গেছি। কার সঙ্গে কী সমীকরণ ছিল, কত বছর কে কোথায় ছিল ভেবে কী হবে। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে অতীত আছে। অতীত যদি আমাদের আটকে রেখে দেয়, এগোতে পারব না। লোকের পারসেপশন, রাজ কী ভাবছে, রুক্মিণী কী ভাবছে। আমরা এরকম ভাবি না। আমাদের হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাপোর্ট না থাকলে এটা সম্ভব হত না।
দেবকে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে?
...নিশ্চয়ই ইচ্ছে আছে। দেবের মতো একজন অভিনেতাকে নিয়ে কাজ করব না কেন, যদি সে রকম স্ক্রিপ্ট হয়, কেন করব না।
এখনকার ট্রোল সংস্কৃতি নিয়ে কী বলবেন? যার দারুণ রূপ সদ্য আপনি দেখেছেন।
...ট্রোল আমাদের খুব একটা অ্যাফেক্ট করে না। তখনই সরব হলাম, যখন মনে হল এক্সপ্লেন করা দরকার। নয়তো ভুল ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছিল। বিষয়টা পরিবারের মধ্যে ঢুকে পড়ল, দেখলাম বাচ্চাদের নিয়ে মন্তব্য করছে, তখন আমরা রিঅ্যাক্ট করেছি। আমি দেখলাম, এই ট্রোল যারা করে, তাদের মানসিক সমস্যা আছে। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদটা যেন সোশাল মিডিয়াতেই। আমরা জানিই এরকম ট্রোলড হতে হবে। ফলে দেখো, খ্যাতির বিড়ম্বনা বলে একটা কথা আছে।
সম্প্রতি একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, প্রযোজক যেনতেন প্রকারে হল ভরাতে চান। সে ফ্যানদের দিয়ে হোক বা কর্পোরেট বুকিং করে।
...একজন তার ব্যবসা কীভাবে সামলাবে তার ব্যাপার। অসুবিধার কী আছে। এটা যদি এখনকার ট্রেন্ড হয়, তা হলে হবে। এটা যদি ব্যবসা হয়, বিজনেস মডেল কীভাবে চালনা করব, সেটা আমি ঠিক করব। এটা তো কোনও অপরাধ নয়। প্রযোজক পয়সা খরচ করে দশটা লোক ঢোকালে অসুবিধা কী।
শুরুতে এটা করলে কি দর্শক বাড়ে?
...বাড়লে বাড়বে, না বাড়লে না। যে করছে তার স্ট্র্যাটেজি নিশ্চয়ই আছে। এটা সারা ভারতেই হয়। এটাও মার্কেটিংয়ের অংশ এখন। প্রথমদিনে ভালো কালেকশন দেখাতে পারলে ডে টু ডে বেটার হবে। মানুষ পারসেপশনে বিশ্বাস করে এখন। কোয়ালিটি চেক করে সোশাল মিডিয়ায় বা কোথায় কী দেখা যাচ্ছে। অতএব পারসেপশন গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে প্রযোজক-পরিচালক হিসেবে সেই মডেল নেবেন?
... প্রথমে দেখব যদি ছবি চলছে তো ভালো। যদি মনে হয়, যথেষ্ট টাকা আছে, তাই দিয়ে এটা করা যায়, তা হলে করব। একই সঙ্গে করবই বা করব না বলছি না। চাইব এমনিই দর্শক আসুক। ওই ভাবে দর্শক ঢুকিয়ে হিট করানো যায় না। যে ছবিটা লাগার চান্স আছে, সেটাকে একটু বুস্ট করে দেয় ওই বিষয়টা। এটাও বিজনেস পলিসি।
