প্রশ্ন: ‘লাখ টাকার লক্ষ্মীলাভ’ এতটা সফল হবে আশা করেছিলেন? সেকেন্ড সিজনের চারশো দশ পর্ব অতিক্রান্ত।
সুদীপ্তা: একেবারেই আশা করিনি। আমার নন-ফিকশন করতে খুব ভালো লাগে। আগে শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কখনও নন-ফিকশন করা হয়নি। সব সময় শুনেছি, উনি বাংলার নন-ফিকশন কিং। টিভি-র দৈনিক কিছুতে নাম লেখানোর কোনও প্ল্যান ছিল না। যেহেতু শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় আর গেম শো তাই রাজি হয়েছিলাম।
প্রশ্ন: সবচেয়ে বড় কথা, অন্য দুটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিযোগী চ্যানেলেও নয় এই শো, বরং সান বাংলায়।
সুদীপ্তা: হ্যাঁ, সেই অর্থে তেমন ভিউয়ারশিপ ছিল না এই চ্যানেলের। সেই সময় ‘লাখ টাকার লক্ষীলাভ’ অক্সিজেন এনে দেয়, বিজনেস পার্সপেক্টিভ থেকে। আর মানুষকেও অক্সিজেন দিয়েছে। একদম গ্রাসরুট লেভেলের শো। শোয়ের টার্গেট পার্টিসিপেন্ট – যাদের কাছে কিচ্ছু নেই। আমরা চার মাসের প্ল্যান নিয়ে নেমেছিলাম ’২৪ সালের ডিসেম্বরে। ওই ডিসেম্বরেই বোঝা গিয়েছিল, আমরা যা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা সেখানে আটকে নেই। যে কারণে ৩১ মার্চ গ্র্যান্ড ফিনালে হয়ে প্রথম সিজন শেষ হল। আর পরদিনই সেকেন্ড সিজন চলে আসে (হাসি)। এই শো সমাজে কীভাবে বদল আনছে ভাবতে পারবেন না। খুব টাকার দরকার বলেই সাধারণ মেয়েরা খেলতে আসে। মান্থলি ফিনালেতে সেলিব্রিটিরা এসেও টাকা দিয়ে যান। লক্ষ্মী ব্যাঙ্কে কত সাধারণ মানুষও ডোনেট করে যান। যে জিততে পারেনি কিন্তু টাকার প্রয়োজন তাঁর যেন কাজে লাগে। মানুষকে ভীষণ ছুঁয়ে যাচ্ছে শো-টা সব মিলিয়ে।
প্রশ্ন: বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
সুদীপ্তা: চারপাশ দেখে যা বুঝছি, মানুষ খুব স্বস্তি পেয়েছে। যে যাক, এবার একটু নিশ্বাস ফেলতে পারব। আদৌ তারা তা পারবে কি না এটা বুঝতে আরও বছর দেড়-দুয়েক লাগবে।
প্রশ্ন: এর ফলে টলিউডে বদল আসবে মনে হয়? ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সহাবস্থান হবে?
সুদীপ্তা: সহাবস্থান তো ছিল। আমি অনেক কম বয়স থেকে অভিনয় করছি। তখন থেকে আর্টিস্টস ফোরামে আছি। কোনওদিন এগজিকিউটিভ কমিটির মেম্বার হইনি। সাধারণ সদস্য হিসেবে রয়েছি। আমি রূপাদিকে সেক্রেটারি দেখেছি, বুম্বাদাকে সেক্রেটারি দেখেছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রেসিডেন্ট দেখেছি। বাম মনস্ক মানুষরা ছিলেন। আবার ঘোষিত কংগ্রেস ভরত কলকেও অনেকদিন দেখেছি। যখন ২০১১-এ রাজ্যে পালাবদল হয়, নানা মানসিকতার, বিশ্বাসের মানুষ তো সহাবস্থান করেছে। কোনওদিন ফোরামে সমস্যা হয়নি। গলা ধরে চেপে ধরা শুরু হল ২০১৪-১৫ সাল থেকে।
সুদীপ্তার সফল জার্নি
প্রশ্ন: এখন সামনে আসছে অভিযোগ, অগের শাসক দলের অনুগত থেকে অনেক কাজ পেয়েছেন, আবার অনেকে কাজ পাননি অনুগত না থাকার কারণে। তেমন কিছুর সম্মুখীন হয়েছেন?
সুদীপ্তা: আমি বরাবরই কাজ কম করেছি, কী জন্য কাজ পাইনি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এটা ঠিক খুব লেটলি, আমার রিলিজ হওয়া সিনেমা, আমি যে সিনেমাতেই অভিনয় করেছি সরকারি হল পায়নি। আমি যে নাটকে অভিনয় করেছি সরকারি হল পায়নি। আমার কাজের প্রোমোশনের সময় অনেকেই খবর ছাপেনি বা সন্তর্পণে আমাকে এড়িয়ে শুধু খবরটুকু করা হয়েছে। একাধিক পরিচালকের কাছে শুনেছি ‘সুদীপ্তাকে নেবে? তাহলে তো নন্দন পাবে না।’ এমনও শুনেছি ‘সুদীপ্তাকে নিয়ে নাটক করলে গিরিশ মঞ্চ বা রবীন্দ্র সদন পাবে না।’ এটা মেনে নিয়ে কোন কোন পরিচালক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। বাট দিস ওয়াজ দেয়ার। নানা কারণেই আমার কাছে কাজ কম আসে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই কাজ করতে পারিনি এমনটা ভাবি না।
প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রিতে অলিখিত ব্যান সংস্কৃতি চলে আসে একসময়, যার শিকার আপনি সরাসরি না হলেও...
সুদীপ্তা: না, আমি প্রায় সরাসরি এর প্রভাব টের পেয়েছি। আমার স্বামী অভিষেক (সাহা) তো ব্যানড। সেই প্রসঙ্গেই যাচ্ছিলাম। ফেডারেশনের বিরুদ্ধে যে সব পরিচালকরা এককাট্টা হয়েছিলেন তঁাদের মধ্যে অভিষেক ছিল। একসময় পরিচালকরা কোর্টে কেস করেন। তখন ফেডারেশন সভাপতি সকলকে বোঝান যে এটা টেকনিশিয়ান বিরোধী। পরে দেখা যায় যখন যার ছবি ঘোষণা হচ্ছে, সে মামলা থেকে নাম সরিয়ে নিচ্ছে। নিশ্চয়ই এটা প্রিকন্ডিশন ছিল যে নাম সরানো না হলে ছবি করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত ১৫ জন থেকে যান। তখনও পরমব্রত ছিল, এছাড়া অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরি, সুব্রত সেন, সুদেষ্ণা রায় আরও কয়েকজন থেকে যান। এই ১৫ জনের লিস্ট বিভিন্ন গিল্ডে চলে গিয়েছিল। অভিষেকও ব্যানড হয়ে যায়। তিন বছর এভাবেই চলেছে।
সঞ্চালিকা হিসেবে সফল সুদীপ্তা
প্রশ্ন: সংসার চালাতে তো বেগ পেতে হয়েছিল?
সুদীপ্তা: অবশ্যই। দুজনে মিলে তো সংসার চালাই। সংসার তো শুধু অর্থ দিয়ে চলে না। ইট ইজ মাই ডিউটি টু স্ট্যান্ড বাই মাই হাজব্যান্ড। উল্টোটাও সত্যি। যখন কোভিডে দু’জনেরই কাজ ছিল না, আমিই ভেবেচিন্তে অ্যাক্টিং অ্যাকাডেমিটা করি। তবে অভিষেকের যা মানসিক অশান্তি দেখেছি, কী বলব! বাইরে থেকে ওর ভেঙে পড়া বোঝা যায় না। পরিচালকের কাছে কাজ না থাকলে টাকা আসবে কোথা থেকে? কোর্টের খরচ দেবে কোথা থেকে! অভিষেক যখন পারছে না, আমাকে সাপোর্ট করতে হয়েছে। আমার পরিবার আর্থিক ভাবে, মানসিক ভাবে সাফার করেছে। অভিষেক এখনও ডিপ্রেশনে।
প্রশ্ন: তার মধ্যেও আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন...
সুদীপ্তা: হ্যাঁ, তখন আমি প্রতিবাদী কিছু লিখতে গেলে অভিষেক বলত, ‘আমি অলরেডি ব্যানড। তুমি আর কিছু বোলো না। ফ্যামিলিটা চালতে হবে।’ ‘অহনা’, ‘আপিস’ ছবি রিলিজের সময় ভুগেছি আমি। ‘আপিস’-এর সময় কেউ-ই ছবিটা চালাতে চায়নি।
প্রশ্ন: তখন কি দেবের সঙ্গে কথা বলেছিলেন? আপনারা সহকর্মী। দেব এখন ব্যান সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরব।
সুদীপ্তা: না, না। দেব তো ফেডারেশন বা ফোরামের মাথা নয়, ইনফরমেশন মিনিস্টারও নয়। দেব আমার সহকর্মী। লাভিং ব্রাদারলি কলিগ। আমি কোনওদিন কারও থেকে ফেভার নিইনি, কোনও পার্টির লোকের থেকে না। বড়জোর বাবা-মা মারা যাওয়ার পর চুল্লিতে যাতে বিরাট লাইনে না পড়তে হয় তার জন্য বলেছি। এর বেশি ফেভার নেবও না, যাতে এই কথাগুলো বলতে পারি।
প্রশ্ন: এভাবেই চালিয়ে গেলেন এতদিন...
সুদীপ্তা: নিজেকে দারুণ অভিনেত্রী মনে করি না। এত বছর টিকে গেছি যখন সামথিং হ্যাজ ওয়ার্কড ফর মি। ডানাকাটা পরিও নই তাও থেকে গেছি, সেটার জন্যও তো কিছু সম্মান প্রাপ্য।
আপিস মুক্তি পেয়েও কাটেনি আর্থিক সমস্যা।
প্রশ্ন: নতুন সরকারের কাছে কী চাহিদা ও প্রত্যাশা?
সুদীপ্তা: যে যেটা বলতে চাইছে, করতে চাইছে করতে দিন। অবশ্যই ল অ্যান্ড অর্ডার মেনে। বাকস্বাধীনতা যেন আটকে দেবেন না। যে কবিতা, গান, বা সিনেমা বানাতে চাইছে, তাকে বানাতে দিন। এআই চলে এসেছে। চার-পাঁচ বছর পর টেকনিশিয়ান আর কত লাগবে? শিল্পীও হয়তো লাগবে না। সেখানে এতজন না হলে কাজ করতে দেব না, আন্ডার টেবল ওইটা না দিলে রিলিজ করতে দেব না, এগুলো করে ইন্ডাস্ট্রি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার এক বন্ধু ভোটের রেজাল্টের দিন বম্বেতে ছিলেন। তিনি বলছেন, অবাঙালিরা বলছে ‘তাহলে এবার কলকাতায় শুটিং করা যাবে।’ যে ইন্ডিপেনডেন্ট ছবির জন্য, ছোট ছবির জন্য নন্দন তৈরি হল সেইখানে মন্ত্রীর বান্ধবীর ছবি দিয়ে হোর্ডিং করে তঁার অভিনীত ছবি শুধু চলবে! দেখতে চাই সেই সব অভিনেত্রীর কেরিয়ার এবার কী হবে। যাদের ছাড়া গত কয়েক বছরে বাংলা ছবি হচ্ছিলই না।
প্রশ্ন: আর নতুন ছবি?
সুদীপ্তা: অনেকগুলো ছবি পড়ে আছে। সুমন ঘোষের ‘ফ্যামিলিওলা’ শেষ করলাম, উইন্ডোজ-এর ছবি। খুব মজা পেয়েছি, এটা ওঁর সঙ্গে পঞ্চম কাজ।
