কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের হাত ধরে উন্মোচিত হতে চলেছে অর্থ উপার্জনের নতুন দিগন্ত। রবিবার অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের বাজেট ঘোষণায় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এল সংশ্লিষ্ট বিষয়টি। যে খাতে দশ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে চলেছে মোদি সরকার। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে 'কন্টেন্ট ক্রিয়েশন' স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমেও অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই যে বর্তমানে এই পেশার দিকে ঝুঁকছে, সেটা সোশালপাড়ার 'কন্টেন্ট কালচার'ই বলে দেয়। এবার সরকারের তরফে মান্যতা পাওয়ায় বাংলার ইনফ্লুয়েন্সাররা কে, কী বলছেন, যাঁরা নেশার টানেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কন্টেন্ট ক্রিয়েশনকে?
সরকার টাকা বরাদ্দ করেছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। তবে এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কোনও অ্যাজেন্ডা হলে কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা অসুবিধের মুখে পড়বেন।
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে কুণাল বোস জানালেন, "একদিন মেনস্ট্রিম মিডিয়া বদলাতে চলেছে, সে আভাস আগেই পেয়েছিলাম। এবং ডিজিটাল মাধ্যমই একদিন জায়গা করে নেবে, সেটাও শুনতাম। এর পরই পেশাবদলের সিদ্ধান্ত নিই। আজ যখন আমরা সোশাল মিডিয়ায় কাজ করছি, তখন দেখছি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মার্কেটে সোশাল মিডিয়ায় 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটিং' খুব বড় একটা জায়গা করে নিয়েছে। টেলিভশন এবং সংবাদপত্রের বিপুল জনপ্রিয়তার মাঝেই ঘরে ঘরে মানুষ এখন সোশাল মিডিয়াকে মানুষ অনেক বেশি গ্রহণ করছে। সেকারণেই এখানে একটা বিশাল কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সোশাল মিডিয়া থেকে কত টাকা আয় করা যায়, সেই ধারণা আগে মানুষের ছিল না। তবে বদলে যাওয়া 'সিনারিও' দেখে মানুষ অনেক বেশি 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটিং'য়ের দিকে ঝুঁকেছে। যদিও সেটা ভুলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখান থেকেই হয়তো বিষয়টিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিকরণের সিদ্ধান্ত সরকারের।"
শুনছিলাম, সরকারী প্রকল্প নিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করলে সরকার ১-২ লক্ষ টাকা দিচ্ছে। এরকম উদ্যোগ হয়তো সেই ভাবনা থেকেই। আমার কাছেও 'ই-টুয়েন্টি তেল যে ভালো সেটা দর্শককে বোঝানো'র প্রস্তাব এসেছিল।...
এতে বিদ্যমান ক্রিয়েটাররা কীভাবে লাভবান হবেন? এপ্রসঙ্গে কুণালের মন্তব্য, "কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা শিক্ষকতা করার সুযোগ পাবেন এবং ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারবেন, এটা নিঃসন্দেহে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আগামীদিনে 'কন্টেন্ট ক্রিয়েশন' যদি সঠিক পথে সঠিক হাত ধরে এগোয় তাহলে প্রচুর ছেলেমেয়ে সোশাল মিডিয়াকে পেশার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। এটা এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে বয়সের উর্ধ্বে গিয়ে আট থেকে আশির প্রজন্ম, এমনকী জন্মের পর থেকেও বাচ্চারা আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। সেকথা মাথায় রেখেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিসাধনের জন্য এটা যে সরকারের বড় পদক্ষেপ, তা বলাই বাহুল্য।"
"কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো খবর", বলছেন অরিজিৎ চক্রবর্তী। তাঁর সংযোজন, "'কন্টেন্ট ক্রিয়েশন' যে ভারতবর্ষের বুকে একটা বড় জায়গা নিচ্ছে, এটা তার অন্যতম প্রমাণ। প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণাই বলছে, কন্টেন্ট তৈরিও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং পেশা হিসেবে উঠে আসছে। দ্বিতীয়ত, কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদেরও দায়িত্বও এক্ষেত্রে আরও বেড়ে গেল। সরকার টাকা বরাদ্দ করেছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। তবে এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কোনও অ্যাজেন্ডা হলে কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা অসুবিধের মুখে পড়বেন। সেক্ষেত্রে তাঁরা নিরপেক্ষতাও হারাবে।"
সরকারের টাকা পেতে হলে যদি কিছু নিয়মাবলীর মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে মৌলিক কাজ একটু হলেও ধাক্কা খাবে।
বাজেটে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের উপর জোর দেওয়ায় মুখ খুলেছেন বং গাই কিরণও। তবে তাঁর কাছে এহেন উদ্যোগ যেমন ইতিবাচক, তেমনই উদ্বেগের! কেন? কিরণ বলছেন, কন্টেন্ট ক্রিয়েটিং এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনও মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্ক আর খানিক ভালো ক্যামেরা থাকলেই তৈরি করতে পারেন। কাজের জন্য আলাদাভাবে কারও দ্বারস্থও হতে হয় না, সেইজন্যই সেক্টরটা এত ফুলেফেঁপে উঠেছে। তবে এখানে একটা কিন্তু রয়েছে! মাঝখানে আমি শুনছিলাম, সরকারী প্রকল্প নিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করলে সরকার ১-২ লক্ষ টাকা দিচ্ছে। এরকম উদ্যোগ হয়তো সেই ভাবনা থেকেই। আমার কাছেও 'ই-টুয়েন্টি তেল যে ভালো সেটা দর্শককে বোঝানো'র প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু আমি জানতাম, আমাদের দেশের যানবাহনের জন্য এটা ভালো নয়। হয়তো সেভাবেই প্রকল্পের খারাপ দিকগুলিকে ভালোয় মুড়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের মারফৎ জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বিষয়টি যদি সেদিকে গড়ায়, তাহলে মুশকিল! তবে আমার মনে হয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটিং স্বাধীনভাবে করাই ভালো। আর শেখার জন্য তো ইউটিউব রয়েইছে। এক্ষেত্রে হয়তো ক্যামেরা, স্টোরি টেলিং শেখা যাবে। তবে এরকম কোর্স বহু আগে থেকেই চলে আসছে।"
ঝিলাম গুপ্তা বলছেন, "ভালো খবর, তবে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাজ। সেক্ষেত্রে সরকারের টাকা পেতে হলে যদি কিছু নিয়মাবলীর মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে মৌলিক কাজ একটু হলেও ধাক্কা খাবে। এবং কীসের ভিত্তিতে ক্রিয়েটাররা এই সুবিধেভোগ করতে পারবেন, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।"
