পার্কস্ট্রিট। 'সেক্যুলার' শহরের এক বিস্ময় চারণক্ষেত্র। নিউ ইয়ার কি বাংলা নববর্ষ, শারদোৎসব, কালীপুজো থেকে ভায়া ইদ 'টু' ক্রিসমাস, উৎসব-অনুষ্ঠানের বাইরেও নিত্যদিন এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভিড় মেশে। চাইনিজ, মোগলাই, কন্টিনেন্টাল... খাবারের রকমারি সম্ভার। পাণীয়ে গলা ভিজিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেদার আড্ডার এই মিলনক্ষেত্র বরাবরই 'কলকাত্তাইয়া'দের কাছে হট ফেভারিট দিবা-নিশিঠেক। বাঙালি আবার বরাবরই মুক্তমনা। ভিনদেশী কালচার আত্মীকরণে একনম্বর। যদিও ভাষা কিংবা খাদ্যাভাস নিয়ে মাঝেমধ্যে 'জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি' ট্যাগ কপালে জোটে, তবে গর্বিত বাঙালি সেসবে থোড়াই কেয়ার করে? এবার অভিনেতা-ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তীর 'অজান্তে' গোমাংস ভক্ষণ নিয়ে 'সেক্যুলার' শহরে শোরগোল।
কেউ বা প্রশ্ন তুলেছেন, কন্টেন্টের নামে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়া কি খুব প্রয়োজন ছিল? যদিও একাংশ আবার নিজেকে 'ব্রাহ্মণ' বলে দাবি করা সায়ককে মগড়াহাটের বিফ হালিম রসাস্বাদনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তবে সেসব ভ্রাম্যমান ত্বত্ত্বে ফোকাস না ঘোরানোই শ্রেয়! এদিকে টেলি-অভিনেতার লাইভ দেখে 'মৌন' সেলেবমহলেও প্রতিবাদের জোয়ার।
সোশাল-মৌজা থেকে পাড়া-ঠেক সর্বত্র ঢি-ঢি পড়েছে, কি না পার্কস্ট্রিটের রেস্তরাঁয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনৈক বেয়ারা তাকে পাঁঠার বদলে গোমাংস পরিবেশন করেছেন। সংশ্লিষ্ট রেস্তরাঁ যে বিগত কয়েক দশক ধরে মাথা তুলে 'বিফ স্টেক' পরিবেশন করে আসছে, সেখবর কলকাতাবাসীর কাছে নতুন নয়! কিন্তু প্রশ্ন, অর্ডার বিভ্রান্তি নাকি বেয়ারার ধর্মপরিচয়? ইস্যু কোনটা? 'গলদ' খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম হওয়ার জোগাড়! গীতাপাঠের দিন ময়দান চত্বরে মাংসের প্যাটিস বিক্রি করা দিন আনি দিন খাই দোকানিকে হেনস্তার ঘটনা খুব পুরনো নয়। সেদিনও ধর্ম নিয়ে কারবারিদের কানমুলে শহরবাসী বুঝিয়ে দিয়েছিল কলকাতা আজও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। এবার ছাব্বিশের পড়ন্ত জানুয়ারির শেষবেলাতেও 'এটা কলকাতা' বলে হুঁশিয়ারা দাগা সায়ক চক্রবর্তীকেও সেশহরই পাঠ দিল, কাস্ট/ ক্লাসের উর্ধ্বে গিয়ে ওই বেয়ারাও প্রথমত একজন মানুষ। এবং এদেশের নাগরিক হিসেবে তাঁরও মৌলিক অধিকার রয়েছে। তাই গোটা ঘটনাটা ফেসবুক লাইভে কিংবা ফোনবন্দি করার আগে তাঁর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক ছিল। কেউ বা প্রশ্ন তুলেছেন, কন্টেন্টের নামে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়া কি খুব প্রয়োজন ছিল? যদিও একাংশ আবার নিজেকে 'ব্রাহ্মণ' বলে দাবি করা সায়ককে মগড়াহাটের বিফ হালিম রসাস্বাদনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তবে সেসব ভ্রাম্যমান ত্বত্ত্বে ফোকাস না ঘোরানোই শ্রেয়! এদিকে টেলি-অভিনেতার লাইভ দেখে 'মৌন' সেলেবমহলেও প্রতিবাদের জোয়ার।
যদিও একাংশ আবার নিজেকে 'ব্রাহ্মণ' বলে দাবি করা সায়ককে মগড়াহাটের বিফ হালিম রসাস্বাদনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তবে সেসব ভ্রাম্যমান ত্বত্ত্বে ফোকাস না ঘোরানোই শ্রেয়! এদিকে টেলি-অভিনেতার লাইভ দেখে 'মৌন' সেলেবমহলেও প্রতিবাদের জোয়ার।
পাঁঠা বলে গরুর মাংস খাওয়ানো হল সায়ক চক্রবর্তীকে, ছবি- ফেসবুক
অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, "চুপ করেই থেকেছি। কারণ চিরকাল ভেবেছি, অন্যের কাজ নিয়ে আমি বলার কে? তাই শত অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও চুপ থেকেছি। কিন্তু এবার আর সম্ভব নয়। সায়ক এইবার যেটা করেছে, তা হিংসায় উসকানি এবং রাজ্যের শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা। এহেন কর্মকাণ্ড যে অবুঝ মনে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তাই করজোরে সকলের কাছে অনুরোধ, এদেরকে নিজের সোশাল মিডিয়া অ্যালগোরিদম থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। কাকে উদযাপন করা উচিত বা অনুচিত? সেটা বুদ্ধি করে নির্বাচন করুন।" ব্যাঙ্গাত্মক সুরে ঋত্বিক চক্রবর্তী প্রশ্ন ছুড়লেন, "মটন মাখা-সন্দেশ পানিফল বিফ, চিনেবাদাম কোনটা কী, খেয়ে বোঝো না? তোমার স্বাদ কোরক নেই কুসুম?" অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া ওই বেয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে সায়কের উদ্দেশে সৌরভ পালোধীর মত, "গরীব মানুষটার চাকরি থাকবে নাকি যাবে? ওসব ভেবে লাভ নেই। আমার কনটেন্ট নেমে গেছে। একবারও ওই ভদ্রলোকের অনুমতি নেওয়া হয়েছে ভিডিও করার আগে? 'এটা কলকাতা' বলে আবার চমকাচ্ছে! যার পারমিশন ছাড়া ভিডিও করলে, সেও এই কলকাতার, ঠিক যতটা তোমার।" পরিচালক পালোধীর সংযোজন, "তোমার যদি ধর্মীয় কোনও উদ্দেশ্য না থাকত, তাহলে ব্রাহ্মণ-মুসলমান, এসব শব্দ না তুলে, শুধু ভুল অর্ডার নিয়ে আলোচনা করলেই হত। আর সেই আলোচনার ভিডিওর প্রয়োজন ছিল না।"
ব্যাঙ্গাত্মক সুরে ঋত্বিক চক্রবর্তী প্রশ্ন ছুড়লেন, "মটন মাখা-সন্দেশ পানিফল বিফ, চিনেবাদাম কোনটা কী খেয়ে বোঝো না? তোমার স্বাদ কোরক নেই কুসুম?"
সায়কের শুক্রবারের লাইভে প্রোপাগান্ডার গন্ধ খুঁজে পেলেন পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ও। তিনি বলছেন, "সমস্যা হল, এই ধরণের প্রোপাগান্ডা গুলোর বিরুদ্ধে যাঁরা বলছেন, যাঁরা লিখছেন, তাঁদের নতুন করে কিছু বলার নেই, তাঁরা সচেতন। অন্যদিকে যাঁরা এহেন প্রচার করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এবারে যে মধ্য অংশের মানুষজন এই প্রচারে পা দিচ্ছেন, ধরে নিতে হয় তাঁদের যুক্তিবোধ যথেষ্ট কম কিংবা নেই। সেখানে আমাদের প্রচার বক্তব্য পৌঁছতেই পারে না। সেটা এক আলাদা পৃথিবী। দায় এড়াতে পারি না, কিন্তু প্রতিবাদ করেও তো কিছু তো হচ্ছে না। বরং সেটা আরও ছড়াচ্ছে।" কেউ বা আবার 'অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভাত মেরে' কন্টেন্টের নামে ক্রিয়েটারদের রসাতলে যাওয়া 'রিল কালচারে'র উপদ্রবে বিরক্ত প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশ্ন একটাই, ভুল অর্ডার টেবিলে নিয়ে যাওয়া অপরাধ, নাকি ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে অর্ডার (বিফ/মাটনের) গুলিয়ে ফেলাটা অপরাধ?
