শুক্রবারই শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হেনস্তার অভিযোগে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শমীক অধিকারীকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সংশিষ্ট ইস্যুতে এদিন গোপন জবানবন্দি দিতেও রাজি হন ওই নির্যাতিতা। তার প্রাক্কালেই সংবাদের মাধ্যমের কাছে সেই বিভীষিকাময় রাতের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নির্যাতিতা। যা শুনলে শিউড়ে উঠতে হয়!
ঠিক কী জানিয়েছেন তিনি? পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হল বয়ান। নির্যাতিতার মন্তব্য, "শমীক নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করছে তাই বন্ধুর মতোই ডেকেছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমি যাই। ওর মা-বাবার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে কাজে সাহায্য করি জিনিসপত্র গোছাতে। পরেরদিন যেহেতু কলেজ ছিল তাই রাত ৯টা নাগাদ আমি বেরনোর জন্য ক্যাব বুক করতে যাই। আমার হাত থেকে তখনই মোবাইল নিয়ে যেতে বারণ করে শমীক। এরপরই আমার মোবাইল ঘাঁটা শুরু করে। সেখানেই অন্য এক ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দেখে ওর অহমবোধে আঘাত লাগে। এরপরই দরজা বন্ধ করে আমাকে মারধর শুরু করে। তখনও ওর মা-বাবা ওখানে উপস্থিত। আমি তখন যেটাই উত্তর দিই না কেন, সব কথাতেই আমাকে মারছিল। মারের চোটে আমার এক চোখ ফুলে যায়। আমার চোখের নিচে এখনও কালশিটে পড়া। এরমাঝে আমার চিৎকার শুনে ওর মা-বাবা আসে। তখন ও নিজে সুইসাইডের হুমকি দেয়। ওর বাবা-মা তাতেই ভয় পায়। কিন্তু আমাকে মারছে দেখেও ওরা আমাকে একা ফেলে চলে যায়। আমি ওর মাকে ইশারা করে বলতে থাকি 'আন্টি, কাউকে একটা ফোন করো।' কারণ আমার ফোন আমার কাছে ছিল না। কিন্তু ওর মা আমার কথা না শুনেই আমাকে ওখানে ছেড়ে চলে যায়। কারণ ওরা নিজেই ভয় পাচ্ছিল শমীকের এহেন রূপ দেখে।" এরপর?
বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তরুণী। তাঁর কথায়, শমীক আমাকে মারতে মারতে জিজ্ঞেস করছিল- 'তোর কি খুব লেগেছে?' আমার মুখটা ধরে দেখে আমার চোখ ফুলে গেছে। কালশিটে। আমি যখন ছেড়়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। তখন আবারও আমাকে সপাটে মারে। তখন আমি চিৎকার করে উঠি। আমি এমনিতেই চশমা ছাড়া দেখতে পাই না। মারের চোটে তখন আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। রাতভর এরকম পাশবিক আচরণ করেছে। ওর মা তারপর এসে আমার জামাকাপড় চেঞ্জ করিয়ে দেয়। তখন আমি বারবার বাড়ি ফেরার জন্য শমীক এবং ওর মা-বাবার কাছে অনুরোধ জানাই। কিন্তু ওরা আমার চেহারা দেখে আমাকে বাইরে যেতে না বলে। সেসময়ে আমার শরীর ছেড়ে দিয়েছিল। মারের চোটে আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। তার পরের ঘটনা খুব অস্পষ্ট আমার কাছে।"
শমীক অধিকারী, ছবি- ইনস্টাগ্রাম
আগেও কি শমীক অধিকারী এধরণের আচরণ করেছেন? জবাবে নির্যাতিতা জানান, "না, এটা আমার সঙ্গে প্রথম। তবে এই ঘটনা বাইরে যাওয়ার পর ওর অনেক প্রাক্তন এবং বন্ধুরাও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ভিডিও প্রমাণ সমেত। ওরাও শমীকের কাছে যৌনহেনস্তার শিকার। ও কী কী করেছে? সব প্রমাণ আছে আমার কাছে। এরকমও অনেকে যোগাযোগ করেছেন, যাদের সঙ্গে আমার পরিচয়ও নেই। আমি ভেবেছিলাম, আমিই প্রথম। তবে আমার কাছে এখন এরকম অনেকের ছবি আছে, যারা ওর অত্যাচারের শিকার। তারাও আমাকে বলছে- 'এটা তোর একার সঙ্গে হয়নি। আমাদের সাথেও হয়েছে। আমরা কেউ কিছু বলিনি। কেউ কিছু করিনি।' নির্যাতিতার সংযোজন, "মারধরের মাঝেই শমীক আমাকে হুমকি দিচ্ছিল- 'তুই কিছু করে দেখ। তুই এখান থেকে বেরিয়ে দেখ, তোকে মার্ডার করে দেব। তোর মৃত্যু আমার হাতেই আছে।' ওর বাবা থামাতে আসায় তাঁকেও প্লাইয়ের টুকরো নিয়ে তাড়া করে শমীক...", বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নির্যাতিতা।
প্রসঙ্গত শুক্রবার আলিপুর আদালতে পেশ করা হয় শমীককে। তার আইনজীবী দাবি করেন, শমীকের সঙ্গে ওই তরুণীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। যদি কোনওরকম শারীরিক সম্পর্ক হয়েও থাকে তাহলে তা দু'তরফের অনুমতিতেই হয়েছে। সরকারি তরফের আইনজীবী জানান, অভিযুক্ত ইনফ্লুয়েন্সার ওই তরুণীকে বাড়িতে আটকে রেখে দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে। শুধু তাই নয় ওই তরুণীর সারা শরীরে একাধিক ক্ষতচিহ্ন মিলেছে। রয়েছে চোখের তলায় কালশিটের দাগ। নির্যাতিতাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে জানান সরকারি আইনজীবী। উভয়পক্ষের কথা শুনেই অভিযুক্ত শমীক অধিকারীর জামিনের আবেদন খারিজ করে তাকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত।
