১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। দর্শকের রোষে খেলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কাকে। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ছেন অপরাজিত থাকা ভারতীয় ব্যাটার। এই দৃশ্যটির কথা অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে আজ। বিনোদ কাম্বলির অকালপ্রয়াণকে এক ক্রিকেটারের মৃত্যুসংবাদ হিসেবেই শুধু নয়, আরও বড় আতসকাচে দেখতে হবে। যে আতসকাচের নাম সময়! গত শতকের নয়ের দশকে একটা সময় এমনও এসেছিল, যখন অনেকে বলতে শুরু করেছিলেন এই ছেলেটা শচীনকেও ছাপিয়ে যাবে! দুই বন্ধুর জীবন পরবর্তী সাড়ে তিন দশকে পেরিয়ে গিয়েছে বহু পথ। আর সেই পথের প্রান্তে পড়ে থেকেছে দুই ভিন্ন কাহিনি। একদিকে এক সাফল্যখচিত রূপকথা, যেখানে গল্পের শেষে সকলেই সুখী হতে পারে। অন্যদিকে এক বিষণ্ণ রূপকথা, ডানা মুচড়ে যাওয়া পাখির মাটিতে আছড়ে পড়ার গল্প! যা বুঝিয়ে দেয়, সব রূপকথার পরিণতি সুখেরই হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
২১ বছর ৫৪ দিন বয়সে পরপর দুটি টেস্টে ডবল সেঞ্চুরি। ১৯৯৩ সাল সেটা। সবে অর্থনৈতিক উদারতাবাদের পথে হাঁটা শুরু করেছে দেশ। চারপাশে পরিবর্তনের হাওয়া। বিদেশি পণ্যেরা ঢুকতে শুরু করেছে দেশীয় বাজারে। দূরদর্শনের পর্দা থেকে ইএসপিএনের মতো বেসরকারি চ্যানেলে এরপর শুরু হবে ক্রিকেটের দুরন্ত সম্প্রচার। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দাম’ বাড়তে শুরু করেছে। আর সেই নতুন যুগের মশাল যাঁর হাতে তিনি শচীন তেণ্ডুলকর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র বছর তিনেক কাটিয়েই তিনি নিজেকে প্রমাণ করে দিয়েছেন। কপিল দেবের মতো তারকা তখনও অবসর নেননি। তবু মিস্টার ইন্ডিয়ান ক্রিকেট হয়ে উঠেছেন শচীনই। এহেন মহাতারকাকে কড়া চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছিলেন কাম্বলি। কেননা শচীনের ডবল সেঞ্চুরি পেতে তখনও অনেক সময় বাকি। টেস্টেই কেবল নয়, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটেও দ্বিশতরান তাঁর অধরা। ওয়ানডে সেঞ্চুরিও হয়নি। অথচ কাম্বলি জীবনের তৃতীয় টেস্টেই দুশোর গণ্ডি পেরিয়ে গেলেন। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ইংল্যান্ড। পরের টেস্ট জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে, ২২৭। এরপর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে টেস্ট সিরিজে এল জোড়া শতরান (১২৫ ও ১২০)। তিনটি ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে পরপর তিনটি শতরান করার সেই নজির আর কেউ ছুঁতে পারেনি। আজও। এখানেই শেষ নয়। ১৪ টেস্ট ইনিংসে হাজার রান। সেটাও ভারতীয় হিসেবে রেকর্ড। কারও পক্ষে ভাবা সম্ভব ছিল না এমন অসাধারণ উৎক্ষেপণের পরও গন্তব্যের বহু দূরে থেমে যাবে কাম্বলির উড়ান!
একদিকে এক সাফল্যখচিত রূপকথা, যেখানে গল্পের শেষে সকলেই সুখী হতে পারে। অন্যদিকে এক বিষণ্ণ রূপকথা, ডানা মুচড়ে যাওয়া পাখির মাটিতে আছড়ে পড়ার গল্প! যা বুঝিয়ে দেয়, সব রূপকথার পরিণতি সুখেরই হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্কুলক্রিকেটেও কাম্বলি শচীনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই সাফল্যকে চেটেপুটে উপভোগ করেছেন। ১৯৮৮ সালের হ্যারিস শিল্ডের সেমিফাইনালে ৬৬৪ রানের জুটি গড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল সারদাশ্রম বিদ্যা মন্দিরের দুই কিশোর। তাদের একজন ৩২৬। অন্যজন ৩৪৯। হ্যাঁ, সেই বিশ্বরেকর্ডও কাম্বলির অবদানই বেশি ছিল। তাঁর রনজি কেরিয়ার শুরু হয় ছক্কা হাঁকিয়ে! ওয়ানডে কেরিয়ার শুরু ১৯৯১ সালে। টেস্ট অভিষেক ১৯৯৩ সালে, একথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু কে জানত এমন ঝকঝকে কেরিয়ার শুরুর পরও মাত্র ২৩ বছর বয়সেই জীবনের শেষ টেস্ট খেলে ফেলবেন কাম্বলি! ওয়ানডে কেরিয়ার অবশ্য টিকবে ২০০০ সাল পর্যন্ত. দুটি বিশ্বকাপও খেলা হবে। কিন্তু সব মিলিয়ে শুরুর সেই জৌলুস যেন গায়েব হয়ে গিয়েছিল। ছিয়ানব্বই বিশ্বকাপের যে ম্যাচটির কথা দিয়ে এই লেখা শুরু হল, সেদিন দর্শকদের কারও যেন মন গলেনি কাম্বলির কান্না দেখে। কেননা, কারওই বিশ্বাস হয়নি, খেলা পুরো হলে কাম্বলি ম্যাচটা জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে পারতেন। ততদিনে কাম্বলির গ্রহণযোগ্যতা কমতে শুরু করেছে হু হু করে।
এ যেন দক্ষ ঔপন্যাসিকের কলমে আশ্চর্য বিপরীতমুখী চরিত্রের দুই বন্ধুর জীবনকাহিনি। যেখানে একজন সাফল্যের পর সাফল্যে ক্রমশ নিজেকে উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। হয়ে উঠছেন অবিসংবাদী বিশ্বসেরা। অন্যজনের মাথার উপরে ঝলমলে আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে! আর এই ব্যর্থতার মুহূর্তে কাম্বলি এমনকী শচীনকে কাঠগড়ায় তুলতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর দাবি ছিল, শচীন তাঁর জন্য যথেষ্ট করেননি! পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, একটা বিরক্তি বোধ থেকেই তিনি এমন মন্তব্য করে বসেছিলেন। জানিয়ে দেন, ২০১৩ সালে হওয়া তাঁর দু'টি অস্ত্রোপচার-সহ আরও নানা প্রয়োজনে সবচেয়ে আগে যিনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি শচীন। বাল্যবন্ধুর জন্য যথাসাধ্য করেছেন মাস্টার ব্লাস্টার। এমনকী, সম্প্রতি অসুস্থ কাম্বলির পাশে দাঁড়াতে তৈরি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও তিনি থেকেছেন। যখন যতটা পেরেছেন কাম্বলির জন্য করে গিয়েছেন। তাঁদের বন্ধুত্বে ফাটল কোনওদিনই তাই ধরেনি। হ্যাঁ, হয়তো সময়ে সময়ে অভিমান জমেছে। যা সত্যিকারের বন্ধুত্বে খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। শচীন কি বুঝতেন না, কাম্বলির ওই 'বিরক্তি' আসলে নিজের প্রতিই। তাই তিনি যাই বলুন, শচীন বন্ধুর পাশ থেকে সরেননি।
এ যেন দক্ষ ঔপন্যাসিকের কলমে আশ্চর্য বিপরীতমুখী চরিত্রের দুই বন্ধুর জীবনকাহিনি। যেখানে একজন সাফল্যের পর সাফল্যে ক্রমশ নিজেকে উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। হয়ে উঠছেন অবিসংবাদী বিশ্বসেরা। অন্যজনের মাথার উপরে ঝলমলে আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে!
আসলে মাঠের বাইরে ডিস্কোর নৈশ জীবন এবং হইহুল্লোড়ের ভিতরে শরীরটার ক্ষতি হতে থেকেছে। নষ্ট হয়েছে ফিটনেস। ধ্বংস হয়েছে ফোকাসের নিবিড়তা। সারা জীবনে জড়িয়েছেন অজস্র আইনি ঝামেলায়। নিজেরই আবাসনে গুন্ডামি, মদ খেয়ে গাড়ি চালানো এমনকী পরিচারিকাকে নিগ্রহের অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। নিজেকে নিয়েই হয়তো তাই ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হতে থেকেছেন বিনোদ গণপতি কাম্বলি। কিন্তু সময় পেরিয়ে গিয়েছিল অনেকটা পথ। ভুলের পথ। যে ভুল পেরিয়ে আবার ফিরে আসা যায় না। তাই সব বুঝেও কাম্বলি ক্রমেই অন্ধকারে ঢাকা পথে হেঁটে চলে গেলেন। সব বুঝেও অসহায়ের মতোই সেই প্রস্থান দেখলেন লিটল মাস্টার। 'বিটলস'-এর সেই বিখ্যাত গান মনে পড়ে। 'হোয়াট উড ইউ ডু ইফ আই স্যাং আউট অফ টিউন?/ উড ইউ স্ট্যান্ড আপ অ্যান্ড ওয়াক আউট অন মি?' বিনোদ কাম্বলির জীবনের গান বেসুরো হওয়ার পরও শচীন দাঁড়িয়ে থেকেছেন। বন্ধুর পাশে। একথা কাম্বলিও জানতেন। দিনের শেষে বন্ধুর কাছে যে এইটুকুই প্রত্যাশা। বন্ধু যেন পাশে থাকে। জীবনের শেষপর্বে এসেও কাম্বলি তাই ঠিকই বুঝেছিলেন, জীবনে যত ভুলই তিনি করে থাকুন না কেন, বন্ধু চিনতে শেষপর্যন্ত কোনও ভুল তিনি করেননি।
