শুক্রবার সন্ধ্যার পরপর মণীশ ওঝাকে ফোনে পেতে বেশ সময়ই লাগল। কখনও শোনা গেল, 'অন্য কলে ব্যস্ত!' আবার কখনও, 'এই পথের সব লাইন ব্যস্ত।' অবশেষে বার কতক ফোন করার পর পাওয়া গেল তাঁকে। ওহ, দেখুন দেখি। মণীশের পরিচয়ই তো দেওয়া হয়নি। মণীশ ওঝা পেশায় ক্রিকেট কোচ। আর তাঁর বিখ্যাততম ছাত্রের নামটা এখন ক্রিকেট ধরিত্রীতে সকলের মুখে মুখে। কেউ সবিস্ময়ে উচ্চারণ করেন, কেউ কিঞ্চিৎ মুগ্ধতার সঙ্গে।
বৈভব সূর্যবংশী। ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। ক্রিকেট গ্রহের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অধিপতি। মণীশকে যখন ফোনে পাওয়া গেল, ততক্ষণে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষের পর আরও একটা ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। বৈভবরা হাতে ট্রফি তুলে-টুলে নিয়েছেন। উচ্চগ্রামের না হলেও, বিশ্বজয়ের উদযাপনও সেরে ফেলেছেন তাঁরা। কিন্তু মণীশের গলার উত্তেজনা একবিন্দু কম হয়নি। "আজ আমি দারুণ খুশি। দীর্ঘদিন আগে আমরা কয়েকজন যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার একটা অংশ পূরণ হল," বলছিলেন তিনি। সঙ্গে যোগ করলেন, 'বৈভব এটা আমাকে সেরা উপহার দিল।"
তিনি বলেন, "আজ আমি দারুণ খুশি। দীর্ঘদিন আগে আমরা কয়েকজন যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার একটা অংশ পূরণ হল।"
বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশীর হাত ধরে মণীশের ক্যাম্পে হাজির হয়েছিলেন খুদে বৈভব। তারপর থেকে সেটাই ছিল তাঁর দ্বিতীয় ঘর। সেসব কথা মনে করে 'বিস্ময় প্রতিভা'র প্রথম গুরু শোনালেন, "এই সাফল্য দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল। যে পরিশ্রমটা বৈভব করেছে, আমরা করেছি। একটা সময় ছিল, যখন ও রোজ পাঁচশো-ছ'শো বল খেলত নেটে। সেই প্রস্তুতিই ওকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে।" এদিন হারারে স্পোর্টস ক্লাবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের হয়তো সর্বকালের সেরা ইনিংসটা খেলেছেন বৈভব। সেই তাণ্ডবের নেপথ্যে রয়েছে মণীশের পরামর্শও। "এবার বিশ্বকাপে বৈভব যে খারাপ খেলছিল, তা নয়। কিন্তু কোথাও যেন চেনা ছন্দে ছিল না। তাই সেমিফাইনালের পর ওর সঙ্গে কথা বলি। কয়েকটা টেকনিক্যাল বিষয় শুধরে নিতে বলি," গর্বিত স্বরে শোনালেন মণীশ। বৈভবের টেকনিকের কোন ভ্রান্তি শুধরে দিয়েছিলেন তিনি? মণীশ বলে চলেন, "ওকে বলি, বাউন্সার খেলার সময় তোর মাথা পিছিয়ে যাচ্ছে। পিছনের হাঁটু ভাঙছে। সেসব খেয়াল রাখবি খেলার সময়। দ্রুত শেখার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ওর। আমার পরামর্শ যে ও কাজে লাগিয়েছে, তা তো ফাইনালে দেখাই গেল।" আরও একটা কথা বৈভবকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন মণীশ। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে একটাও সেঞ্চুরি না কথা। তিনি বলেন, "রনজি ছাড়া বাকি সব প্রতিযোগিতায় বৈভবের অন্তত একটা সেঞ্চুরি আছে। সেটাই আমি ওকে মনে করিয়ে দিই। বলি যে, তুই সব জায়গায় সেঞ্চুরি করিস। এখানে করিসনি এখনও। ফাইনালে সুযোগ হাতছাড়া করিস না।" কোচের আশা অপূর্ণ রাখেনি বৈভব।
ভারতীয় বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, একবারের বেশি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ মেলে না। সেখানে বৈভব দাঁড়িয়ে পনেরোর দোরগোড়ায়। অর্থাৎ, এখনও দু'টো সংস্করণে হেসেখেলে হাজির হতে পারবে সে। কিন্তু বোর্ডের নীতিতে তা সম্ভব নয়। সেই নীতিতে বদল চান না মণীশও। বরং চাইছেন, এবার তাঁর শিষ্যকে তুলে আনা হোক সিনিয়র টিম ইন্ডিয়ার সংসারে। "বৈভবকে আর কী করতে হবে বলুন তো! এমন কোনও মঞ্চ নেই যেখানে ও রান করেনি। তবে কেন ওকে জাতীয় দলের জন্য ভাবা হবে না?", প্রশ্ন করেন মণীশ। মনে হয় না, ছোটবেলার গুরুর সেই আকাঙ্ক্ষা বেশি দিন অপূর্ণ রাখবে বৈভব।
