অহি ও নকুল। আদা ও কাঁচকলা। দা ও কুমড়ো। আজন্ম কিংবা জাতিগত শত্রুতা বিশ্লেষণে বাংলা বাগধারায় যে সমস্ত উপমা-সমষ্টি সচরাচর ব্যবহৃত হয়, লিখলাম উপরে। বাংলার খেলাধুলোর প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে যার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল। তবে তা বাদ দিলেও একখানা 'জন্ম-বৈরিতা এই ভূখণ্ডে বিরাজ করে বটে। ফি বছর যার জন্ম হয় আইপিএলের ইডেনে, জ্বলন্ত বিতর্ক কাঁখে নিয়ে। অ, বুঝলেন না বুঝি? জলবৎ তরলং কিন্তু। ইডেন পিচ এবং কেকেআর। আইপিএলের বিগত আঠারো বছরের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, কেকেআরের সবচেয়ে অভিযোগের জায়গা থেকেছে ইডেন পিচ। সরকারি ভাবে। বেসরকারি ভাবে।
ইডেনের পূর্বতন মুখুজ্জ্যেমশাইয়ের (প্রয়াত ইডেন কিউরেটর প্রবীর মুখোপাধ্যায়) আমল থেকে যা প্রবাহিত হয়ে দ্বিতীয় মুখুজ্জ্যেমশাইয়ের (বর্তমান ইডেন কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়) জমানাতেও সমান বিদ্যমান। বরাবর নাইট রাইডার্স অনুযোগ করে এসেছে যে, ঘরের মাঠে পছন্দের পিচ তারা চেয়েও পায় না। গত বছরই স্মরণ করুন। ইডেন বাইশ গজ নিয়ে কী রকম 'শুম্ভ-নিশুম্ভ' যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল দু'পক্ষে! ইডেনে 'হোম অ্যাডভান্টেজ' না পাওয়া নিয়ে কেকেআর অধিনায়ক অজিঙ্ক রাহানের প্রকাশ্য বিষোদগার, দুই ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলে এবং সাইমন ডুলের তা নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে বসা, সিএবির পাল্টা বোর্ডকে প্রতিবাদী চিঠি পাঠানো-কে আজও ভুলতে পেরেছে?কেকেআর বরাবর বলে এসেছে যে, তাদের মহাশক্তি স্পিন। পরাশক্তি বরুণ-নারিন, পেস নয়। ঘরের মাঠে ঘূর্ণি তারা পাবে না কেন? সিএবি আবার প্রত্যুত্তরে বলেছে যে, আইপিএলের জন্য ইডেন 'ভাড়া' দেওয়া হয় মাত্র। দু'মাসে গোটা সাতেক ম্যাচ খেলার জন্য কোন যুক্তিতে পিচ-চরিত্র বদলানো হবে? তা-ও, বোর্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত কিউরেটর নির্মিত বাইশ গজকে? ভাড়াটের দাবিতে মালিক বাড়ির কাঠামো বদলে ফেলে নাকি?
তা, বুধবার প্রভৃত ভাবে মনে হচ্ছিল, গেল। আবার লাগল। পিচের তাজা সবুজ আভা যে ক্লাবহাউস লোয়ার টিয়ার থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘাস আছে, বেশ ঘাস। মঙ্গলবার ইডেনে এসেও উইকেট দেখার দিকে যায়নি কেকেআর। কিন্তু এ দিন দফায়-দফায় পিচ দর্শন চলল। প্রথমে, নাইট কোচ অভিষেক নায়ার। দ্বিতীয় দফায়, অভিষেক রাহানে। পার্শ্ববর্তী ভদ্রলোক যিনি নাইট ম্যানেজমেন্টের নানাবিধ প্রশ্নাবলীর উত্তর-প্রভৃতি দিচ্ছিলেন, নামটা আর না লিখলেও চলে। ইডেন কিউরেটর সুজনবাবু। চিত্রনাট্যে এ সমস্ত দৃশ্যপট থাকলে, স্বাভাবিক পরবর্তী পর্ব হল-সাংবাদিক সম্মেলন এবং তাতে পিচ নিয়ে বিস্তর হল্লা। অত্যাশ্চর্য হল, বুধবার তা ঘটলই না! আরও বলা ভালো, কেকেআর কোচ অভিষেক নায়ার ইডেন পিচ নামক ফুটন্ত-কড়াইয়ে হাতই ছোঁয়ালেন না। নায়ার প্রথমে একটা অদ্ভুত কথা বললেন। বললেন যে, পিচ নিয়ে মন্তব্যে 'অ্যান্টি করাপশন ইউনিট' অনুমতি দেবে কি না, জানেন না। তবে তাতে নিস্তার পেলেন না নাইট কোচ। বরং বাইশ গজ নিয়ে গোটা কতক প্রশ্ন তাঁকে আরও ছেঁকে ধরল। বলা হল, গত বছর সাতটার মধ্যে চারটে খেলায় ইডেনে হেরেছে কেকেআর। একটা বরবাদ করেছে বৃষ্টি। এর পরেও পিচ গুরুত্বপূর্ণ নয়? নায়ার জবাবে যা বললেন, নির্যাস নিচে তুলে দিলাম, "ইডেন পিচের ঘাস দেখে আমি চমকে যাইনি। কারণ, গত কয়েক দিন বাদলা ছিল। মাঠকর্মীদের পক্ষে পিচ তৈরি করা সহজ ছিল না। আমাদের যে পিচ দেওয়া হবে, তাতেই খেলব আমরা। তার থেকে যতটা সম্ভব, ফায়দা তোলার চেষ্টা করব। কোনও অভিযোগ-অজুহাত ছাড়া।"
নায়ার আরও বললেন, "আমি জানি না, আগে কী বলা হয়েছে। আমার দর্শন হল, মাঠে নেমে যে পিচ থাকবে, তাতেই খেলো। আর কার কোনটা হোম অ্যাডভান্টেজ কে নিশ্চিত করে বলতে পারে? ধরা যাক, আপনি টার্নার তৈরি করলেন। দিন শেষে, সেটা আপনারই বিপক্ষে গেল। তখন?ট্রু পিচ থাকা সব সময় ভালো। সে পিচে প্লেয়াররা খেলতে পছন্দ করে। দর্শকরা খেলা দেখে আনন্দ পায়। এক-পাক্ষিক পিচ নয়। ফেয়ার পিচ আমার পছন্দের। হোম অ্যাডভান্টেজের অর্থ পছন্দের পিচ নয়। আমার কাছে হোম অ্যাডভান্টেজ হল, সমর্থকদের সামনে খেলার সুযোগ। চেনা মাঠে খেলার সুযোগ।" পরে শুনলাম, ইডেন কিউরেটরের কাছে গিয়ে নাকি একই দাবি করে এসেছে কেকেআর। অর্থাৎ, চিরাচরিত ঘূর্ণির আবদার থেকে সরে তারা নাকি 'ফেয়ার' পিচের দিকে ঝুঁকেছে। ভালো পিচ চাইছে। বরং ইডেন মাঠকর্মীরাই ছুটকো চিন্তায়, বিশ্বকাপে বাইশ গজের 'ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ার'-এ আক্রান্ত পিচ কেমন আচরণ করবে, তা নিয়ে। বল কিছুটা ঘুরতে পারে। কিন্তু মাঠকর্মীদের কেউ কেউ এ দিন জোর দিয়ে বললেন যে, কেকেআর টার্ন চায়নি। ভালো পিচ চেয়েছে।
চাওয়ার উপায়ও নেই বিশেষ। নারিন-বরুণ দু'জনেই যে প্রবল প্রহার-প্রাপ্ত হয়েছেন ওয়াংখেড়েতে। নারিন তবু একখানা ম্যাচে। বরুণের শনির দশা সেই বিশ্বকাপের দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ থেকে চলছে। যা কবে কাটবে, কেউ জানে না। ভারতীয় অফস্পিনারকে এ দিনও নেটে অঙ্গকৃষ রঘুবংশী অবলীলায় পরপর মাঠের বাইরে ফেললেন। বৃহস্পতিবার একই জিনিস অভিষেক শর্মা-ট্রাভিস হেড-ঈশান কিষানরা চালালে কী হবে, ভাবলে গা শিরশির করছে। যন্ত্রণার এতে শেষ নয়। ক্যামেরন গ্রিন বল করতে পারবেন না নিদেনপক্ষে আরও তিনটে ম্যাচে। গ্রিনকে জেনেবুঝে কেকেআর নিলাম থেকে কিনেছিল কি না, তা নিয়ে অস্বস্তিজনক প্রশ্ন উঠল। প্রশ্ন গেল, মাথিশা পাথিরানার সর্বশেষ ফিটনেস আপডেট নিয়েও। শুধু ঈষৎ শান্তি লাগছে, স্রেফ দু'টো বিষয় ভেবে। সরি, তিনটে।
এক, সানরাইজার্সের বিরুদ্ধে কেকেআরের রেকর্ড বরাবর ভালো। আজ পর্যন্ত তিরিশ সম্মুখসমরে কেকেআর জয়লাভ করেছে কুড়িখানা ম্যাচে। সানরাইজার্স দশটায়। দুই, সাইনরাইজার্সের সমগ্র বোলিং কেকেআরের চোট-আঘাতগ্রস্ত পেস লাইন আপের চেয়েও দুর্বল। প্যাট কামিন্স পরে যোগ দিলেও আদৌ কতটা উন্নতি হবে, সন্দেহ। তিন, ইডেনে নিজের খেলা শেষ ম্যাচে ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন নাইট ওপেনার ফিন অ্যালেন। গত মাসে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে। আজ সেই একই পিচে নামবেন অ্যালেন, নামবে কেকেআর। করুন কিছু তিনি। করুন কিছু আবার অ্যালেন, করুন কিছু বরুণ-নারিন, জিতুক কেকেআর, মিটুক ঝঞ্ঝাট। কে না জানে, হারলে অবধারিত ভাবে অভিযোগের তর্জনী উঠবে ফের ইডেন বাইশ গজের দিকে, তা সে অভিষেক নায়াররা এ দিন যতই 'সুমিষ্ট বাক্য' প্রদান করে যান না কেন! বিশ্বাস করুন, প্রত্যেক বছর একই চর্বিতচর্বণ লিখতে একটুও ভালো লাগে না।
