রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু: ২০১/৮ (রজত ৬৩, কোহলি ৩২, রবি বিষ্ণোই ৩২/২)
রাজস্থান রয়্যালস: ২০২/৪ (বৈভব সূর্যবংশী ৭৮, ধ্রুব জুরেল ৮১*, ক্রুণাল পাণ্ডিয়া ৩০/২)
রাজস্থান রয়্যালস ৬ উইকেটে জয়ী।
বৈভব সূর্যবংশীর কাছে ম্লান বিরাট কোহলি! লাইনটা লিখলেও অস্বস্তি থেকে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। একজন গত ১৫ বছর ধরে ভারতীয় ক্রিকেটের 'মুখ'। ভক্তদের 'কিং'। আরেকজনের বয়সই সবে ১৫। কিন্তু বৈভবকে দেখে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ যে সুরক্ষিত, তা নিশ্চয়ই কোহলিও মেনে নেবেন। মাত্র ২৮ বলে ৭৬ রান। যার সুবাদে কোহলির রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে ৬ উইকেটে হারাল রাজস্থান রয়্যালস। লিগ শীর্ষেও রইলেন রিয়ান পরাগরা। কিন্তু বৈভব নামের ১৫ বছরের এক 'কোহিনূর' যে জেল্লা ছড়াল, তা বহুদিন মনে থাকবে ক্রিকেটভক্তদের।
অসমের বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামে এমনিতে প্রচুর রান ওঠে। কিন্তু এদিন বৃষ্টির জন্য ম্যাচ শুরু হয় এক ঘণ্টারও বেশি সময় পরে। এই আবহাওয়ায় টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি রাজস্থান অধিনায়ক রিয়ান। ম্যাচের প্রথম বলেই তাঁর পরিকল্পনা সার্থক করলেন জোফ্রা আর্চার। দেশের জার্সিতে সতীর্থ পেসারের বলের বাড়তি বাউন্স বুঝতে না পেরে উইকেট দিয়ে এলেন ফিল সল্ট। কিছুক্ষণ পর দেবদত্ত পাড়িক্কলও আউট। বিরাট কোহলি শুরুটা ভালোই করেছিলেন। ১৬ বলে ৩২ রানও করে ফেলেন। কিন্তু রবি বিষ্ণোইয়ের বলের লাইন বুঝে উঠতে পারেননি। রাজস্থান স্পিনারের বল ভিতর দিকে ঢুকে উইকেট ভেঙে দেয়। এরপর দ্রুত ফিরে যান ক্রুণাল পাণ্ডিয়া, জিতেশ শর্মা ও টিম ডেভিড। শেষ দু'জনের উইকেট নিলেন ব্রিজেশ শর্মা। যাঁর উত্থান বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি থেকে। মাঝেমধ্যে লাইন গন্ডগোল করলেও ২ উইকেট নিয়ে ফের নজর কাড়লেন।
ব্রিজেশ, আর্চার, নান্দ্রে বার্গারদের দাপটের মধ্যেও অবিচল ছিলেন একজন। রজত পাতিদারকে নিয়ে খুব একটা চর্চা হয় না। কিন্তু ঠিক নিজের কাজটা করে দেন না। দল যখন ১২৫ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, সেখান থেকে পরের তিন ওভারে ৪০ রান তুলে লড়াইয়ের জায়গায় নিয়ে গেলেন। আরসিবি'র রান ২০০-র পেরোল ভেঙ্কটেশ আইয়ারের সৌজন্যে। ২৩ কোটি দিয়ে কেনার পর ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেয় কেকেআর। এবার আরসিবি তাঁকে কিনেছে ২ কোটি টাকায়। শেষবেলায় ১৫ বলে ২৯ রান করে সেই ভরসার মর্যাদা দিলেন। তবে তাঁকে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে নামানোয় একজন স্পিনারকে বাদ দিয়েই ফিল্ডিংয়ের সময় নামতে হয় আরসিবি'কে। ২০ ওভারে বেঙ্গালুরু তোলে ২০১ রান।
বর্ষাপাড়ার পিচে এই রানটা তোলা কঠিন নয়। শুরুর দিকের স্যাঁতসেঁতে ভাব কাটিয়ে পিচ ব্যাটিং সহায়ক হয়ে উঠেছে। কিন্তু বৈভবের জন্য এগুলো নেহাতই কয়েকটা শব্দ মাত্র। 'কন্ডিশন', পিচ, আবহাওয়া- সম্ভবত এগুলো ভেবে মাঠে নামে না ১৫ বছরের বিস্ময় প্রতিভা। তার দর্শন খুব সহজ। বল দেখো, মারো। সামনে কে আছে, কী বল করবে, অতো ভেবে লাভ নেই। বুমরাহর প্রথম বলে ছক্কা হাঁকিয়েছিল। এদিন ভুবনেশ্বর কুমার ও জশ হ্যাজেলউড, দু'জনের প্রথম বলেই চার মারল। প্রথম ওভারটা তবু একটু 'দয়া' দেখিয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় ওভারে ১৬ রান তোলা থেকে শুরু হল তার তাণ্ডবনৃত্য। এখানে একটু ভুল করেছিলেন আরসিবি অধিনায়ক রজত। প্রথম ওভারে ভুবনেশ্বর ভালো বল করেছিলেন। আগের মরশুমে বৈভবের উইকেটও তিনিই তুলেছিলেন। কিন্তু এই ম্যাচে চাপ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করে আরসিবি। দ্বিতীয় ওভারে যশস্বী জয়সওয়ালকে অদ্ভুত ডেলিভারিতে ফেরান চোট সারিয়ে কামব্যাক করা হ্যাজেলউড। কিন্তু তৃতীয় ওভার অনভিজ্ঞ অভিনন্দন সিংকে এনে বৈভবকে হাতে উপহার সাজিয়ে দিলেন রজত। তার পরের ওভারে হ্যাজেলউডের বলে বৈভব তুলল ১৯ রান। হাফসেঞ্চুরি এল মাত্র ১৫ বলে। সে বল আপনি যেখানেই করুন, স্লোয়ার-ইয়র্কার-লাইন, সব বলই মাঠের বাইরে। এরপর হাত খুললেন ধ্রুব জুরেলও। খানিক পরে অভিনন্দন সিং ফের এলে এক ওভারে নিলেন ২৪ রান। পাওয়ারপ্লেতে উঠল ৯৭ রান। যা এবারের আইপিএলে সর্বোচ্চ।
তারপরই রানের গতি কিছুটা শ্লথ হয়। অন্যদিকে বৈভবকে ফেরালেন ক্রুণাল পাণ্ডিয়া। নবম ওভারের প্রথম বলের গতি ছিল ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার বেশি। বৈভবের ঠিকঠাক ব্যাটে-বলে হল না। বল সোজা গিয়ে পড়ল লং অনে বিরাট কোহলির হাতে। এটাও যেন ক্রিকেট দেবতার লিখন। বৈভবের ক্যাচ জমা হল কোহলির হাতেই। তখন ১৫ বছরের ক্রিকেটারের নামের পাশে ৭৮ রান। চার ৮টি, ছক্কা ৭টি। আর দলের স্কোরবোর্ডে ১২৯ রান। পরের বলে ফের উইকেট। এবার আউট শিমরন হেটমায়ার। কীভাবে জানেন? স্পিনার ক্রুণাল পাণ্ডিয়ার বাউন্সারে! এবারের আইপিএলে এটা পাণ্ডিয়ার নতুন আবিষ্কার। কিছুক্ষণ পর আউট রিয়ান পরাগ। এবারও বলের মুখ দেখিয়ে স্লোয়ার-সন্দেহে ফাঁদে ফেললেন হ্যাজেলউড। ৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে রাজস্থান কিছুটা চাপে পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু বাকি কাজটা করে দেন ধ্রুব জুরেল ও রবীন্দ্র জাদেজা। বল প্রতি রান দরকার ছিল। মাঝেমধ্যে চার-ছক্কা মেরে কাজটা আরও সহজ করে দেন জুরেল।
বৈভব যদি আগুন হয়, তাহলে জুরেল জল। সাধারণত অক্রিকেটীয় শট খেলেন না। মাথা খুবই ঠান্ডা। বৈভব কাজটা সহজ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ফিনিশিং তো 'আর্ট'। ৪৩ বলে ৮১ রান করে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন তিনি। লিগে অপরাজিত থাকল রাজস্থান। ৪ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বৈভবরা।
