রনজির কোয়ার্টার ফাইনালের তৃতীয় দিন। অন্ধ্রের সত্যনারায়ণ রাজুর বলটা মিড উইকেটের দিকে ঠেলে দিয়ে একটা রান নিলেন। অন্য প্রান্তে পৌঁছেই খুলে ফেললেন হেলমেট। সঙ্গে দু'হাতের গ্লাভসও। তারপর ডান হাতে বল ছোড়ার ভঙ্গি করলেন। শোনা গেল, দলের থ্রোয়ার বাহার আলির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথম শ্রেণির কেরিয়ারে নিজের প্রথম দ্বিশতরানটা উদযাপন করেছিলেন সুদীপ ঘরামি। চতুর্থ দিনের স্কোরবোর্ড বলছে, মারাত্মক কিছু অঘটন না ঘটলে সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়া নিশ্চিত বাংলার। কিন্তু কে জানত, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য 'ট্র্যাজেডি' অপেক্ষা করে আছে!
দ্বিতীয় দিন যখন ব্যাট করতে নামেন সুদীপ, বাংলার রান ৩ উইকেটে ৪৩। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল বাংলার। একটা সময় মনে হচ্ছিল, বড় লিড না পেয়ে যায় অন্ধ্রপ্রদেশ! এরপর বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন সুদীপ। সঙ্গে কখনও পাল্লা দিলেন সুমন্ত গুপ্ত। কখনও শাকির গান্ধী। কিন্তু টলানো যায়নি সুদীপের মজবুত ডিফেন্সকে। তৃতীয় দিনের শেষে ৪৫১ বলে ২১৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। তাঁর লড়াইয়ে মুগ্ধ হয়ে সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বার্তা দিয়েছিলেন, "এবার তিনশো করতে হবে।" সেই লক্ষ্যেই একেবারে নিখুঁত ভাবে এগোচ্ছিলেন সুদীপ। কিন্তু...
চতুর্থ দিন কল্যাণীর ২২ গজ অদ্ভুত আচরণ করছে। বল অনবরত নিচু হয়ে যাচ্ছে। সেটাই 'শত্রু' হয়ে দাঁড়াল সুদীপের। ১৯৩.২ ওভারে শাইক রশিদের বলটা আচমকাই নিচু হয়ে গেল। ব্যাটটা বলের লাইনে গিয়ে নামালেন ২৬ বছর বয়সি ক্রিকেটার। তাতেও রক্ষা করা গেল না। তিনশো থেকে মাত্র একটা রান দূরে 'দুর্ভাগ্যে'র শিকার হওয়া সুদীপ ফিরলেন সাজঘরে। ভাগ্যের পরিহাসে বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীরা তখন হাহুতাশ করছেন। 'ইস, একটা মাত্র রান!' হ্যাঁ এই একটা মাত্র রান কতটা 'ঘাতক' হতে পারে, তা হয়তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সুদীপ!
একটা মাত্র রান করতে পারলে প্রথমবার তিনশো রান করতেন তিনি। সঙ্গে তৃতীয় বঙ্গ ক্রিকেটার হিসাবে এই মাইলফলকও ছুঁতেন। ১৯৯৮ সালে দেবাং গান্ধী, ২০২০ সালে মনোজ তিওয়ারি ছাড়া বাংলার হয়ে ত্রিশতরান করতে পারেননি কেউ। ঘাতক উইকেটের দুর্ব্যবহারে তাঁদের সঙ্গে এক কাতারে বসা হল না সুদীপের। ক্রিকেট ইতিহাসে ২৯৯ রানে আউট হয়েছেন মাত্র তিন জন। কিংবদন্তি কিউয়ি ক্রিকেটার মার্টিন ক্রো (১৯৯১) এবং ওয়েলসের মাইক পাওয়েল (২০০৬)। তাঁদের সঙ্গে অবশ্য একাসনে বসলেন সুদীপ ঘরামি।
বল নিচু হয়ে আউট একা সুদীপ আউট হননি। শাকির গান্ধীও সেঞ্চুরি থেকে মাত্র পাঁচ রান দূরে সুদীপের মতো প্রায় একইভাবে ফিরলেন। এক্ষেত্রেও বোলার শাইক। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে আলোচনায় সুদীপ কুমার ঘরামি। প্রায় তিন দিন ব্যাট করে ৫৯৬ বল উইকেট কামড়ে পড়ে থাকার দৃষ্টান্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের এই রমরমার যুগে দেখা মেলা দায়! প্রথম ইনিংসে অন্ধ্রপ্রদেশের ২৯৫ রানের জবাবে বাংলার ইনিংস শেষ হয় ৬২৯ রানে। শেষ বেলায় একেবারে 'দাবাং' মুডে ধরা দেন মহম্মদ শামি। করেন ৩৩ বলে ৫৩ রান। মারেন তিনটি 'ম্যামথ' ছক্কাও। ৩৩৪ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমেছে অন্ধ্র। অভিমন্যু ঈশ্বরণের দলের সামনে জিতে সেমিফাইনালে ওঠার হাতছানি।
