গৌতম গম্ভীর ও হাসি- অ্যাদ্দিন দু’টো বিপরীতার্থক শব্দ হিসেবে বিরাজ করলেও, রোববারের বিশ্বজয়ের পর তারা যথেষ্ট ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছে! সে বন্ধুত্ব গলায়-গলায় কিংবা মাখো-মাখো পর্যায়ভুক্ত এখনও নয় ঠিকই। কিন্তু যা বুঝছি, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের’ একটা জায়গায় তারা চলে এসেছে, পুরনো ‘শত্রুতা’ ভুলে। ভারতীয় কোচ বিশ্বজয়ের রাতে প্রেস কনফারেন্সে বসে বিবিধ কথার ফোঁকরে ফিকফিকিয়ে হাসছেন, ঠাট্টা-ইয়ার্কি করছেন, অকপটে স্বীকারোক্তি পেশ করছেন যে, অর্শদীপ সিংদের মতো রিল-টিল বানাতে তিনি মোটেই পারেন না– এ মোটামুটি অকল্পনীয় তো বটেই, বিরল দৃশ্যপট তালিকাভুক্ত!
বাকিরাও সুযোগ বুঝে যে যাঁর মতো ফাজলামি মারছেন। রবিবার আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে উপস্থিত মহেন্দ্র সিং ধোনি দেশের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বজয় শেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন, ‘কোচ সাহাব, তোমাকে হাসতে দেখে বড় ভালো লাগছে। হাসি তোমাকে মানায়।’ প্রিয় ‘থালা’কে ময়দানে নেমে পড়তে দেখার পর অর্শদীপরা চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, হয় কখনও? ‘পাঞ্জাবপুত্তর’ দেখলাম একখানা রিল ছেড়েছেন। সেখানে ‘কোচ সাহাব’-এর মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে কাকুতি-মিনতি করছেন, ‘পাজি অব তো হাস দো। থোড়া বহত হাস দো।’ এবং আবার ফিক!
আসলে জয়, বিশ্বপর্যায়ের টুর্নামেন্টের ফাইনালে প্রতিপক্ষকে পদানত করে ঐতিহাসিক জয়। রোববার রাত তিনটেয় আহমেদাবাদের তাজ স্কাইলাইনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তখনও জনা পঞ্চাশ ভারতীয় দলের দর্শনার্থী দাঁড়িয়ে। সূর্যকুমার যাদব-অভিষেক শর্মারা বহুক্ষণ টিম হোটেলের গর্ভগৃহে চলে গিয়েছেন, তবু। হোটেল সিকিওরটি মশা-মাছি গলতে দিচ্ছে না, তবু। আসলে আহমেদাবাদ বিশ্বাসই করে উঠতে পারছে না, আড়াই বছর ধরে যে অভিশাপ তাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে, রাতে ঘুমোতে দেয়নি, দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলো করে ছেড়েছে, তা আর নেই। ৮ মার্চ ২০২৬-এর পর স্রেফ হাওয়া! টিম হোটেলের সামনে ঠায় দাঁড়ানো একজন বললেন, ‘‘আর কেউ বলতে পারবে না, আহমেদাবাদ ভারতের জন্য অপয়া। কেউ বলতে পারবে না, আহমেদাবাদে ফাইনাল দিও না। টিম হেরে যাবে।’’
শতভাগ সঠিক। আর পারবে না কেউ ও সমস্ত বলতে, আর পারবে না কেউ আহমেদাবাদকে যম-যন্ত্রণার ১৯ নভেম্বর, ২০২৩ স্মরণ করিয়ে অপমানজনক কথা শোনাতে। রোববারের আহমেদাবাদে তিন-তিনখানা ইতিহাস যে সৃষ্টি হল। প্রথম, দেশের মাটিতে ভারত প্রথম টিম হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল। দ্বিতীয়ত, ভারতই প্রথম টিম, যারা উপূর্যপরি দু’খানা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল। তৃতীয়ত, ভারতই একমাত্র টিম, যারা রেকর্ড তিন-তিনটে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের সর্বপ্রথম মালিকানা নিয়ে রাখল। যে গরিমা আর কারও নেই। গম্ভীরকেও কি কেউ কিছু আর বলতে পারবে? এরপর সিরিজ-টিরিজ হারলে কেউ আর তাঁর চেয়ার ধরে টানাটানি করতে পারবে? যা গতিপ্রকৃতি বুঝছি, আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে বিশ্বকাপ তো বটেই। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকেও ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ডাবল জি’ কোচের চেয়ারে থেকে গেলে, বিস্ময়ের কিছু হবে না। সূর্যকুমার যাদব–তিনিও অধিনায়ক থাকছেন। রবি রাতে নিউজিল্যান্ডের এক সাংবাদিক সূর্যকে জিজ্ঞাসা করেন যে, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর রোহিত শর্মা সংক্ষিপ্ততম ফর্ম্যাট থেকে অবসর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই তেমন কিছু ভাবছেন না? সূর্য চোখ বড়-বড় করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘‘আমার নেক্সট টার্গেট অলিম্পিক। তার পর আরও একটা বিশ্বকাপ।’’ অর্থাৎ, গম্ভীর-সূর্য জুটিকেই অলিম্পিকে টিম নিয়ে নামতে দেখার সম্ভাবনা সমূহ।
ইডেন গার্ডেন্স। ফাইল ছবি।
বেঙ্গালুরুতে বিরাট কোহলির আরসিবির বিজয়োৎসবকে ঘিরে মর্মান্তিক ঘটনার পর যাবতীয় ‘ভিকট্রি প্যারেড’ বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয় বোর্ড। হরমনপ্রীত কৌররা বিশ্বজয়ী হওয়ার পর কিছু হয়নি। আহমেদাবাদে সূর্যকুমারদের নিয়েও কিছু হল না। সোমবার সকালে শুধু বিশ্বজয়ী ভারত অধিনায়ককে নিয়ে আইসিসি ফোটোশুট করাতে গেল, ব্যস। শুনলাম, আগামী ১৫ মার্চ নয়াদিল্লিতে ভারতীয় বোর্ড আয়োজিত ‘নমন অ্যাওয়ার্ডসে’ বিশ্বজয়ী টিমকে সংবর্ধিত করা হবে। যে অনুষ্ঠান এবার মুম্বই থেকে সরিয়ে নয়াদিল্লিতে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিস থেকে কবে টিমকে ডাকা হবে, তার কনফার্মেশনও এখনও পর্যন্ত নেই। প্লেয়ারদের অনেকে এদিনই বেরিয়ে গেলেন। কোচ গম্ভীরও সন্ধের দিকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলেন। শোনা গেল, সোমবার অনেক সকাল পর্যন্ত বিশ্বজয়ের হুল্লোড় চলেছে। ভোর চারটে নাগাদ টিমকে ডেকে পাঠান গম্ভীর। সেখানে নাকি বলে দেন, বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রচুর কথাবার্তা তিনি বলেছেন। পরামর্শ প্রভৃতি দিয়েছেন। বিশ্বজয়ের পর নতুন করে আর কিছু বলতে চান না। তবে সামনে আইপিএল আসছে। সবাই যেন শরীরের যত্ন-আত্তি করে। বক্তৃতা শেষে প্লেয়াররা গান-টান চালিয়ে নাচানাচি শুরু করেন। কোচকেও তাঁরা নাচার জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন। প্রথমে আপত্তি করলেও, তা আর শেষে ধোপে টেকেনি। সহর্ষ আবদারে সম্মতি দিয়ে গম্ভীরকেও নাকি মৃদু নাচতে হয়েছে!
আর আবেগের সেই ফল্গু-স্রোতে কোথাও যেন মিশে গেল ইডেনও! বিশ্বকাপ ভারতের সেমিফাইনাল বা ফাইনাল–কিছুই পায়নি ইডেন। কিন্তু তার পরেও ইডেনেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বজয়ের ‘ভ্রূণ’! স্বয়ং অধিনায়কই তা বলে গেলেন। মহোৎসবের রাতে সূর্যকুমার বলছিলেন যে, চেন্নাইয়ে জিম্বাবোয়ে বধ ফিরিয়ে এনেছিল টিমের হারানো বিশ্বাস (দু’সপ্তাহ আগে এই আমেদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সঙ্কটে পড়ে গিয়েছিল ভারতের সেমিফাইনাল-যাত্রা)। কিন্তু ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পরই টিম উপলব্ধি করে, ঘরের মাঠে বিশ্বজয় এবার সম্ভব। সূর্য বলছিলেন, ‘‘ইডেনে জেতার পরই আমাদের মনে হতে থাকে যে, এবার আমাদের পক্ষে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব। ইডেনই টার্নিং পয়েন্ট বলতে পারেন।’’ শুনে বেশ লাগল। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর আর কোনও কাপ ফাইনাল পায়নি ইডেন। পেয়েছে বলতে কতিপয় কিছু গ্রুপ স্টেজ ম্যাচ। এবং দু’টো ভারত-বিহীন সেমিফাইনাল। কিন্তু তার পরেও বিশ্বজয়ের সঙ্গে ইডেনের একটা যোগসূত্র থেকে গেল। নিঃসন্দেহে আগামীতেও থাকবে।
কেন, ময়দানি প্রবাদটা শোনেনি? কলকাতার স্থানীয় ক্রিকেটের আকাশে-বাতাসে যা ঘোরে? ইডেনকে আপনি ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন না!
