অনিল কুম্বলে: সহোদরের পরামর্শে মিডিয়াম পেসার থেকে প্রবাদপ্রতিম লেগস্পিনার।
রবিচন্দ্রন অশ্বিন: পেসার হিসেবে ক্রিকেটজীবন শুরু। পরবর্তীতে ভুবনবিখ্যাত অফস্পিনার।
ওয়াসিম আক্রম: স্লো লেফট আর্ম স্পিনার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। শেষে বাঁ হাতি পেসে পৃথিবী কাঁপিয়ে শেষ।
অধুনা ইন্টারনেট যুগে এ হেন চিত্তাকর্ষক তথ্য-সনদ জোটানো কোনও ব্যাপারই নয়। একখানা ছোট ‘ক্লিকে’ টক করে সব বেরিয়ে আসবে। উপরে তিনটে লিখলাম। চাইলে তিনশোটা লেখা যায়। মুশকিল হল, তার পরেও গুগল-কোষাগার সব জানতে পারে না। সমস্ত ক্রিকেটারের ঠিকুজি-কোষ্ঠী পুঙ্খানুপুঙ্খ সংরক্ষণ করতে পারে না। ঠিক যেমন হার্দিক পাণ্ডিয়া!
‘বরোদা বম্বার’ যে এককালে জাঁদরেল লেগস্পিনার ছিলেন, জানেন ক’জন? ক’জন জানেন যে, বরোদার একটা পাতি ক্লাব ম্যাচ ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলিং অলরাউন্ডারের ‘জন্মগ্রহণ’ হয়েছিল? আর সেটাও দুর্ঘটনাবশত?
‘‘মানুষ হার্দিককেই বা জানে-বোঝে কতজন? তাকেও কেউ জানে না। ক্রিকেটার হার্দিকের নেপথ্য কাহিনির খবরও তেমন কেউ রাখে না,’’ শ্লেষাত্মক হাসিতে শুক্রবার কথাটা বলছিলেন যিনি, তাঁর ল্যাপটপে আজও হার্দিকের লেগস্পিন বোলিংয়ের ভিডিও সযত্নে গচ্ছিত রয়েছে! ভদ্রলোকের নাম জিতেন্দ্র পাণ্ডিয়া। যিনি হার্দিকের প্রথম সব কিছু দেখেছেন। তাঁর কোচিংয়ে ভারতীয় অলরাউন্ডার খেলেছেন। এবং ভদ্রলোক নিজে খেলতেন হার্দিকের দাদা ক্রুণাল পাণ্ডিয়ার সঙ্গে!
‘‘বরোদার কিরণ মোরে অ্যাকাডেমিতে খেলতাম আমরা। ক্রুণাল খেলত। হার্দিক আসত ওর সঙ্গে। আমরা সবাই একসঙ্গেই থাকতাম বলতে পারেন। প্রথমে ক্রিকেট নিয়ে এটা-সেটা জিজ্ঞাসা করত হার্দিক। তার পর আমি কোচিং শুরু করানোর পর, কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে গেল,’’ গড়গড়িয়ে বলে যান জিতেন্দ্র। কিন্তু লেগস্পিন? লেগস্পিনার হার্দিক পাণ্ডিয়ার কবে আগমন ঘটল? চিলতে হেসে এবার প্রত্যুত্তর আসে, ‘‘প্রথম থেকেই!’’
শোনা গেল, ২০১০ সাল নাগাদ প্রথম কিরণ মোরে অ্যাকাডেমিতে আসেন হার্দিক। আর মোটেও ছুটকো দু’এক বছর নয়। জুনিয়র পর্যায়ের ক্রিকেটে একটা লম্বা সময় তিনি লেগস্পিন বোলিং করতেন। হার্দিকের সে সময় এক সুহৃদ ছিলেন। শুভম আগরওয়াল। হার্দিক এবং শুভম– দু’জনেই লেগস্পিন বোলিং করতেন। ‘‘আমি প্রায়ই শুভমকে বলতাম, হার্দিকের লেগস্পিনটা দেখ। কী রকম জোরের পর বলটা ছাড়ে। শার্প টার্ন করায়,’’ বলে চলেন জিতেন্দ্র। রীতিমতো স্তম্ভিত লাগে শুনলে। গুজরাতে বিশ্বকাপ কভার করতে এসে হার্দিকের জীবনের গলি-ঘুঁজি পুনরায় অনুসন্ধান না করা, স্রেফ মূর্খামি। কিন্তু তা করতে গিয়ে যে এ হেন রত্ন-কোষের সন্ধান পাওয়া যাবে, কে জানত!
এবং ততোধিক বিস্ময়কর হার্দিকের লেগস্পিন ছেড়ে পেসার-অলরাউন্ডারে রূপান্তরের কাহিনি। শোনা গেল, ক্লাবেরই ম্যাচে একবার পেসার ‘শর্ট’ পড়ে যায়। কোচ জিতেন্দ্রও ফাঁপরে পড়ে যান। যিনি জানতেনও না যে, হার্দিক লুকিয়ে-চুরিয়ে পেস বোলিংটাও করেন! গুরু জিতেন্দ্রকে সর্বপ্রথম খবরটা দেন শুভম। তিনিই বলেন, হার্দিককে চাইলে দেখা যেতে পারে। কারণ, কোচের আড়ালে-আবডালে নেটে পেস বোলিংটাও করে থাকেন হার্দিক। নিরুপায় জিতেন্দ্রর কাছে আর কোনও রাস্তা ছিল না। প্রথমে ভেবেছিলেন, সাপোর্টিং পেসার হিসেবে খেলিয়ে দেবেন। কিন্তু দ্রুত বুঝতে পারেন যে, হার্দিকের বোলিং-তেজে তাঁর টিমের প্রধান পেসারকেই পার্শ্বনায়ক দেখাচ্ছে!
‘‘হিন্দিতে একটা কথা আছে। ভাগাকে আউট কিয়া। হার্দিক ঠিক সেই কাজটা করেছিল সেই ম্যাচে। পাঁচটা উইকেট নিয়েছিল, ব্যাটারকে কাঁদিয়ে। মনে রাখবেন, বিপক্ষ টিমে কিন্তু দলীপ ট্রফি খেলা প্লেয়ার ছিল। দু’তিন জন রনজি ট্রফি খেলা প্লেয়ার ছিল,’’ বলার সময় ফ্ল্যাশব্যাকে খেলাটা যেন আজও দেখতে পান জিতেন্দ্র। কিন্তু শুধু ক্লাব ম্যাচ দিয়ে যে প্রতিষ্ঠা পাবে না মেধাবী ছাত্র, বুঝতে অসুবিধে হয়নি তাঁর। সে সময় বরোদার কোচ দক্ষিণের সনৎ কুমার। জিতেন্দ্র সোজা ধাওয়া করেন তাঁকে। সোজা বলেন, রূপান্তরের হার্দিক নিয়ে তাঁর কী মত? লেগস্পিন ছেড়ে পেস বোলিং করলে রাজ্য দলে জায়গা করে নিতে পারবেন কি না? কারণ, দেশে প্রয়োজন প্রকৃত পেস বোলিং অলরাউন্ডারের। তা, কিশোর হার্দিকের তেজ দেখার পর জিতেন্দ্রর কথা ফেলতে পারেননি সনৎ। কিন্তু প্রতিষ্ঠা লাভের দুর্গম পথ তখনও শেষ হয়নি। এবার ব্যাগড়া দিয়ে বসে বরোদার ম্যানেজিং কমিটি। ঝাড়া দু’ঘণ্টা তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন বরোদা কোচ সনৎকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হয়েছিল, ঠিক কোন কারণে তিনি একজন লেগস্পিনারকে ফাস্ট বোলারের স্লটে নিতে চাইছেন! শোনা যায়, সে বৈঠকের ‘মিনিটস’ খুললে এখনও সমস্ত পাওয়া যাবে!
কিন্তু ওই যে বলে না, প্রথম প্রেম! লেগস্পিন প্রথম ভালোবাসা ছিল হার্দিকের, আজও যাকে তিনি ভুলতে পারেননি। এখনও নাকি বরোদার রিলায়েন্স অ্যাকাডেমির মাঠে গা ঘামাতে গেলে, দু’তিন ওভার লেগস্পিন করে আসেন তিনি! আর খতিয়ান শুনেটুনে মনে হল, ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এ সমস্ত জানতে পারলে বেশ খুশি হবেন।
চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্পিনারদের যা দাপাদাপি চলছে, সে বাজারে একজন ভালো লেগস্পিনার ‘বিনা পরিশ্রমে’ পেয়ে গেলে মন্দ কী?
