ভারত: ২৫৫/৫ (সঞ্জু ৮৯, অভিষেক ৫২, ঈশান ৫৪, জেমস নিশাম ৪৬/৩)
নিউজিল্যান্ড: ১৫৯/১০ (টিম সেইফার্ট ৫২, মিচেল স্যান্টনার ৪৩, বুমরাহ ১৫/৪, অক্ষর ২৭/৩)
৯৬ রানে জিতে বিশ্বকাপ জয়ী ভারত।
ইতিহাস গড়ল, ইতিহাস ফেরাল। পালটাল ইতিহাসও। ফের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা ভারতের মাথায়। ফাইনালে একতরফা ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে উড়িয়ে আবারও বিশ্বসেরা টিম ইন্ডিয়া। এই নিয়ে তিনবার, টানা দু'বার। কারা যেন বলছিল, টানা দু'বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা যায় না! ওসব কথা এখন সবরমতীর জলে ভেসে গিয়েছে। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের কোনা দিয়ে সূর্যোদয়ের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমগ্র ভারতবাসী। যে স্টেডিয়াম ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখের স্মৃতি উপহার দিয়েছিল, সেখানেই ইতিহাস পালটালেন সূর্যকুমার যাদবরা। প্রায় আড়াই বছর পর ঘুচল আহমেদাবাদের 'অপয়া' কলঙ্ক। স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে অভিষেক-সঞ্জু-বুমরাহদের বিশ্ববিজয় দেখলেন গত দু'বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, রোহিত শর্মা।
সেই একই রকম ১ লক্ষ ৩২ হাজার দর্শকে ভরা স্টেডিয়াম, সেরকমই এক ফাইনাল, টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিং। ২০২৩-র ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতি বারবার ফিরছিল দেশের ক্রিকেটভক্তদের কাছে। তাঁদের একরাশ চিন্তা-উদ্বেগ নিয়েই প্রথম বল গড়াল। কিন্তু এবার স্ক্রিপ্ট অন্যরকম লিখলেন সঞ্জু-অভিষেকরা। প্রথম দু’টো ওভার দেখে মনে হয়নি কী ঝড় উঠতে চলেছে! বিশেষ করে অভিষেককে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিলই। বিশ্বকাপজুড়ে রান পাননি। অভিষেক প্রথমে সাবধানী খেললেন। জেকব ডাফির ওভারে দু’টো চার মারলেন ঠিকই, তবে ততটাও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু পরের ওভারে লকি ফার্গুসনের বলে সজোরে ছক্কা হাঁকাতেই যেন ব্যাটে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। তারপর আর ফিরে তাকাননি। ১৮ বলে হাফসেঞ্চুরি করলেন। যখন ৫২ রানে ফিরলেন তখন ভারতের ইনিংস শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গিয়েছে। প্রথম ৬ ওভারে উঠে যায় ৯২ রান।
যে স্টেডিয়াম ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখের স্মৃতি উপহার দিয়েছিল, সেখানেই ইতিহাস পালটালেন সূর্যকুমার যাদবরা। প্রায় আড়াই বছর পর ঘুচল আহমেদাবাদের 'অপয়া' কলঙ্ক। স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে অভিষেক-সঞ্জু-বুমরাহদের বিশ্ববিজয় দেখলেন গত দু'বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, রোহিত শর্মা।
অন্যদিকে সঞ্জু ফের ‘সুপারম্যান’। শুরুটা ধীরেসুস্থে করেছিলেন। তবে একবার গতি পেয়ে যেতেই তাঁকে আর রোখে কে! এদিনও ৪৬ বলে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে গেলেন। ৮টা ছক্কা ও ৫টা চারে সাজানো তাঁর ইনিংস। কিন্তু এদিনও সেঞ্চুরি পেলেন না। ঈশান কিষানও অনবদ্য। ২৫ বলে ৫৪ রান করে আউট হলেন তিনি। দু’জনে যতক্ষণ একের পর এক বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠাচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, রানটা ৩০০-র কাছাকাছি চলে যেতে পারে। কিন্তু জিমি নিশামের একটা ওভার অনেক অঙ্ক বদলে দিল। ১৬ তম ওভারে সঞ্জু, ঈশান ও সূর্যকুমারের উইকেট তুলে নিলেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা স্লোয়ারে-কাটারে শেষবেলায় দুরন্ত কামব্যাকের সমস্ত পরিকল্পনা একা ভেস্তে দিলেন শিবম দুবে (৮ বলে ২৬)। ১৬-১৯ ওভারের মধ্যে উঠেছিল ২৮ রান। সেখানে শিবম একা শেষ ওভারে তুললেন ২৪ রান। ভারতের ইনিংস শেষ হল ২৫৫ রানে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে এই রানটা তাড়া করা কার্যত অসাধ্য। কিন্তু সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ভারতের বিরাট রানকে প্রায় টেক্কা মেরে দিয়েছিল। আহমেদাবাদের ‘কলঙ্ক’ ও শিশির, দুই নিয়ে একটা সরু চিন্তার সুতো তো ঝুলছেই। এই রানটা যথেষ্ট হবে তো? হবে। প্রায় ১০০ রানের মতো বেশিই হবে। যদি দলে জশপ্রীত বুমরাহ কিংবা অক্ষর প্যাটেলের মতো বোলার থাকেন। বুমরাহর ৪টে ওভারে রান হবে না, এটা ধরে নিয়েই যেন মাঠে নামে বিপক্ষ দল। তিনি আসবেন, রান আটকাবেন, উইকেট নেবেন- এটা যেন সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মতো সাধারণ ঘটনা। নিজের প্রথম ওভারেই রাচীন রবীন্দ্রর উইকেট তুলে নিলেন বুম বুম বুমরাহ। ডিপ স্কোয়ার লেগে শরীর ছুড়ে অনবদ্য ক্যাচ নিলেন ঈশান। তবে নিউজিল্যান্ডকে প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন অক্ষর প্যাটেলই। ফাইনালের আগে বলেছিলেন, 'ঘরের মাঠে' তিনি নামলে আহমেদাবাদের ভাগ্য ফিরবে। হলও তাই। তৃতীয় ওভারে এসেই ফিন অ্যালেনকে ফেরালেন। পঞ্চম ওভারে গ্লেন ফিলিপসের উইকেট ভেঙে দিলেন। ওখানেই নিউজিল্যান্ড ব্যাটিংয়ের কোমর ভেঙে দিলেন।
রানের পাহাড় মাথায় চাপছে। চাপ বাড়ছে। কত আর ঝুঁকি নেবে নিউজিল্যান্ড। পাওয়ার প্লে'তে উঠল ৩ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৫২ রান। ভারত দু'টো ক্যাচ ফেলল ঠিকই, কিন্তু অসাধারণ ক্যাচ ধরে কাজের কাজটাও করে দিল। যেমন টিম সেইফার্টের ক্যাচটা। নকআউট থেকে ফর্ম সঙ্গ দিচ্ছিল না বরুণ চক্রবর্তীর। কিন্তু ফাইনালে বিধ্বংসী হয়ে ওঠা সেইফার্টের উইকেটটা পকেটে পুরে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি উইকেটের শিরোপাও তাঁর মাথায়। অবশ্য উইকেটের বেশিরভাগ কৃতিত্বই ঈশান কিষানের। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ ধরে ভারসাম্য সামলে বল আকাশে ছুড়ে ফের তালুবন্দি করলেন। যা দেখে অনেকের মনে পড়তে পারে গত বিশ্বকাপের ফাইনালে সূর্যকুমার যাদবের সেই ক্যাচ।
ফাইনালে যেভাবে বুমরাহ বিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করলেন, তাতে যেন সংশয়ের জায়গা নেই যে তিনিই সীমিত ওভারের ক্রিকেটের 'গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম'। বুমরাহর ৪টে ওভারে রান হবে না, এটা ধরে নিয়েই যেন মাঠে নামে বিপক্ষ দল। তিনি আসবেন, রান আটকাবেন, উইকেট নেবেন- এটা যেন সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মতো সাধারণ ঘটনা।
এরপর আর কোনও নাটকের অপেক্ষা ছিল না। অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার ছাড়া কেউ সামান্যতম প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেনি। অক্ষর ৩ উইকেট তুললেন, ১৫ রান দিয়ে বুমরাহর পকেটে ৪ উইকেট। ফাইনালে যেভাবে বিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করলেন, তাতে যেন সংশয়ের জায়গা নেই যে তিনিই সীমিত ওভারের ক্রিকেটের 'গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম'। কিউয়ি ব্যাটাররা এলেন আর গেলেন। অভিষেক শর্মার বলে জেকব ডাফির ক্যাচ তিলক বর্মা ধরতেই উৎসবের শুরু। এবার আর নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম হতাশ করেনি। স্লোগানে, গানে, সমর্থনে মাতিয়ে রাখলেন ক্রিকেটারদের। ১ লক্ষ ৩২ হাজার জনতা ঘুচিয়ে দিলেন প্রায় আড়াই বছর ধরে আহমেদাবাদের স্টেডিয়ামের মনে জমিয়ে রাখা যন্ত্রণা। ভারত জিতল, বিশ্ব ক্রিকেটে একাধিপত্যের ঝাণ্ডা পুঁতে দিল। তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আর কোনও দেশ জেতেনি। টানা দু'বারও নয়। দেশের মাটিতেও প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতল কোনও দেশ। রেকর্ড? সে তো তৈরি হয় গড়ার জন্য। বিশ্বকাপ? সে তো শুধু ভারতের জেতার জন্যই।
