শেষ মানে শেষ নয়। তা কখনও কখনও নতুন সূত্রপাত। যেমন ইটালি ক্রিকেট টিম। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের আশা শেষ। প্রথমবার বিশ্বকাপে নেমেই যে তারা অঘটন ঘটাবে, এমন আশা সম্ভবত কোনও ইটালিভক্ত করেননি। তবু বিশ্বাসে মেলায় বস্তু! ইটালির ক্রিকেটস্বপ্নের আগে-পরে লেখা থাকবে সেই বিশ্বাস, সেই লড়াইয়ের গল্প। তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, একদিন ক্রিকেটের আকাশে সবার উপরে থাকবে ইটালির তিনরঙা পতাকা। একদিন বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলবেন ইটালির ক্রিকেটাররা। এমনকী ইটালির শহরে শহরে থাকবে ফ্র্যাঞ্চাইজি দল। যেমন হতেই পারে তুরিন নাইট রাইডার্স কিংবা মিলান সুপার কিংস। সেই সব স্বপ্ন, আশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে অকপট ইটালি দলের বাঙালি মিডিয়া ম্যানেজার রাকবির হাসান।
জন্মসূত্রে বাংলাদেশি রাকবির। ২৩ বছর বয়সে ইটালি পাড়ি দেন। তারপর সেখানেই পরবর্তী পড়াশোনা ও কেরিয়ার। বর্তমানে ইটালি ক্রিকেট দলের মিডিয়া ম্যানেজার ছাড়াও সেদেশের আম্পায়ারদের সংগঠনের প্রধান। দায়িত্ব অনেক, অধরা স্বপ্ন তার থেকে অনেক অনেক বেশি। পরিকাঠামো নেই, মানুষের আগ্রহ নেই, রাষ্ট্রের সহায়তা নেই, এমনকী নিজের দেশের প্লেয়ারও নেই। এই 'নেই'য়ের দেশে আছে শুধু ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা। যে দেশ ফুটবল বলতে পাগল, যে দেশের ঝুলিতে চার-চারটে ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফি, সেখানে ক্রিকেট অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কাজটা কতটা কঠিন?
রাকবির বলছিলেন, "আমরা যারা ছোট দেশ থেকে আসি, তাদের কাছে বিশ্বকাপে খেলাটা অনেক বড় স্বপ্ন। আমাদের প্লেয়াররা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কেউ ফ্যাক্টরিতে কাজ করত, কেউ পিৎজা বানাত। আমাদের তো একটা ঠিকঠাক ড্রেসিংরুম পর্যন্ত নেই। সেখান থেকে ওয়াংখেড়ে, চিদাম্বরম বা ইডেন গার্ডেন্সে খেলার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বিশ্বকাপের পর আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে পরিকাঠামো ভালো করা। প্রস্তুতির জন্য বিদেশে ঘুরে বেরিয়েছি। সেটাই নিজের দেশে হলে ভালো হত।"
এবারের বিশ্বকাপ হতে পারে সেই লক্ষ্যপূরণের প্রথম ধাপ। এবারের বিশ্বকাপ এক নতুন স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে ইটালির জন্য। বিশ্বকাপে ওয়াংখেড়েতে নেপালকে হারানো, কিংবা ইডেনে ইংল্যান্ডের চোখে চোখ রেখে লড়াই। নেহাত মন্দ নয়! রাকবিরের পরিকল্পনা, ইটালির ভূমিপুত্রদের ক্রিকেটে নিয়ে আসা এবং স্কুলপর্যায়ে ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়া। আর 'একটু এদিক-ওদিক হলে' ইটালির সুপার এইটে জায়গা করে নেওয়াও অসম্ভব ছিল না বলে মনে করেন তিনি। কথাটা ঠিক! প্রথম ম্যাচে ওয়েন ম্যাডসেনের চোট কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেঞ্জামিন মানেন্তির লড়াইয়ের সত্ত্বেও হার- সব ঠিক চললে অনেক অঙ্ক বদলে দিতে পারত ইটালি।
এবার হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে হবে বলে মনে করেন রাকবির। তাঁর বক্তব্য, "আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ভালো ক্রিকেট খেলা। আমাদের দলে মোসকা ভাইরা, মানেন্তিরা, জশপ্রীত সিংয়ের মতো ভালো প্লেয়ার আছে। আমাদের হাসান আলি কলকাতার পিচে ৪ ওভারে ২০ রানের বেশি দেয়নি। বেঞ্জামিন মানেন্তি বিগ ব্যাশে খেলে।" শুধু বিগ ব্যাশ কেন, এবার কি আইপিএলেও ইটালির ক্রিকেটারদের দেখা যাবে? রাকবিরের ধারণা, তাঁদের প্লেয়ারদের পারফরম্যান্স ফ্র্যাঞ্চাইজিরা নজরে রাখছে। তাই অদূর ভবিষ্যতে ক্রিশ্চান কালুগামাগে বা মার্কাস ক্যাম্পোপিয়ানোকে আইপিএলে দেখা যেতেই পারে।
সর্বপ্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম স্মরণীয় জয় তুলে নিল ইটালি। ছবি: সংগৃহীত
সেই সঙ্গে আরও একটি পরিকল্পনার কথা জানালেন তিনি। ইউরোপে নতুন টি-টোয়েন্টি লিগ চালু হচ্ছে। সেখানে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড রয়েছে। তবে ইটালির কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজি এবার নেই। রাকবিররা এখন অপেক্ষা করছেন। তাহলে কি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স মিলান বা রোম সুপার কিংস কিংবা নেপলস নাইট রাইডার্সের মতো দল দেখা যাবে? রাকবির বললেন, "হ্যাঁ। কেন হয়? নাইট রাইডার্সের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি তো সারা বিশ্বে বিনিয়োগ করছে। সেরকম কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজি যদি বিনিয়োগ করতে চায়, তাহলে আমরা মুখিয়ে আছি। মধ্যযুগে রেনেসাঁ এসেছিল ইটালির হাত ধরেই। এবার ক্রিকেটকে গ্লোবাল করে তুলতে ইটালি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।"
ইটালির ক্রিকেট ইতিহাস যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ১৭৯৩ সালে ইটালিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের পরিসংখ্যান মেলে! কোথায় হয়েছিল সেই ম্যাচ? নেপলস বন্দরে। যাত্রাবিরতির সময় জাহাজের নাবিকরা অংশ নিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলায়। অর্থাৎ ক্রিকেট সেদেশে ফুটবলের চেয়েও পুরনো! ইটালির ফুটবলকে রূপ দিতেও সাহায্য করেছে ক্রিকেটই। সাতবারের ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ক্লাব এসি মিলান ১৮৯৯ সালে ফুটবল অ্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার, সেদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ফুটবল ক্লাব জেনোয়া ১৮৯৩ সালে জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বেনিটো মুসোলিনির আমলে ‘ব্রিটিশদের খেলা’ ক্রিকেট ক্রমশ ব্যাকফুটে চলে যায়। মুসোলিনির নির্দেশ ছিল ‘বিদেশি’ খেলাটি থেকে সরে আসার।
১৭৯৩ সালে ইটালিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের পরিসংখ্যান মেলে! কোথায় হয়েছিল সেই ম্যাচ? নেপলস বন্দরে। যাত্রাবিরতির সময় জাহাজের নাবিকরা অংশ নিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলায়। অর্থাৎ ক্রিকেট সেদেশে ফুটবলের চেয়েও পুরনো! ইটালির ফুটবলকে রূপ দিতেও সাহায্য করেছে ক্রিকেটই। সাতবারের ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ক্লাব এসি মিলান ১৮৯৯ সালে ফুটবল অ্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আশ্চর্যের বিষয়, ইটালির ক্রিকেট বিপ্লব হয়েছে 'বিদেশি'দের হাত ধরেই। এখন যাঁরা ক্রিকেট খেলছেন, তাঁদের অধিকাংশই ভিন্ন দেশের। তবু ইটালি তাঁদের আপন করে নিয়েছে। এখন তাঁরাও 'ফোর্জা ইটালিয়া'। রাকবির নিজে গত ২০ বছর ইটালির বাসিন্দা। ইটালির জল-হাওয়া, সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই মিশে গিয়েছেন যে, বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে জয়ের পর তাঁরা অঝোরে কেঁদেছিলেন। গোটা দেশ জুড়ে দ্রুত ক্রিকেটের বিস্তার হয়েছে। এই মুহূর্তে ইটালিতে নিবন্ধিকৃত ক্রিকেটারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। ক্লাবের সংখ্যা ৮০-৯০। গত মরশুমে প্রায় ৮৫০টা ম্যাচ খেলেছেন। অথচ বছর তিনেক আগে উত্তর-পূর্ব ইটালির মনফালকোনেতে ক্রিকেটকে ‘অ-ইটালীয়’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বলা হয়, বাংলাদেশি অভিবাসীদের 'একঘরে' করার জন্য এটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল। ঘটনাচক্রে বর্তমানে এক বাংলাদেশিই তাঁদের মিডিয়া ম্যানেজার।
তবে এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে কোথাও একটা আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে রাকবিরের। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই। সব ঠিকঠাক চললে এই ইডেনের মাটিতে বাংলাদেশ ও ইটালি মুখোমুখি হত। রাকবিরের সেই স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। কিন্তু কলকাতাকে মন দিয়ে ফেলেছেন। কথা দিয়ে গেলেন, আবার ফিরবেন। ফের হয়তো ইডেনে নামবেন। এবার প্রতিপক্ষ ভারত। কথায় বলে ক্রিকেটে সব সম্ভব। সেই অসম্ভবের ছন্দতে ইটালির ক্রিকেট নতুন স্বপ্ন দেখছে। এবারের বিশ্বকাপে গোটা ক্রিকেটদুনিয়া ঘুম ভেঙে দেখল তাঁদের সেই নাছোড়বান্দা স্বপ্নের বাস্তব ছবি।
