মিস্টার সূর্যকুমার যাদব, রোববার পাকিস্তান প্লেয়ারদের সঙ্গে করমর্দন করবেন?
‘‘দেখতে পাবেন। চব্বিশ ঘণ্টা তো আর পড়ে মাত্র।’’
মিস্টার সলমন আলি আগা, আপনি?
“কাল ভাবব। জানি আমি বলার কেউ নই। কিন্তু ক্রিকেট সব সময় স্পিরিট মেনে খেলা উচিত। এবার বাকিটা ওদের ব্যাপার।’’
অধুনা ভারত-পাকিস্তান সাক্ষাৎ হলে কেমন একটা লাগে যেন। মন খারাপ হয়ে যায়। স্মৃতির ভাগদখল নেয় পুরানো সেই দিনের কথা। খেলার ময়দানে দুই উপমহাদেশীয় চিরশত্রুর দেখা-সাক্ষাৎ, রাজনীতির রাঘববোয়ালদের আকর্ষণ করেছে বরাবর। ভারতের। পাকিস্তানের।
কিন্তু তার পরেও দিন শেষে খেলাটাই মুখ্য ছিল। শচীন বনাম আক্রম। গাঙ্গুলি বনাম ওয়াকার। শেহওয়াগ বনাম শোয়েব। বিরাট বনাম আমের। ভারত-পাক দ্বিপাক্ষিক সিরিজে তালাচাবি পড়ে গিয়েছে, বহু দিন হল। ২০১২-তে শেষ। তবু দু’দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সখ্য ছিল। সৌহার্দ্য ছিল। কেন, এক কালে দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া বিরাট কোহলির রানের ‘দোয়া’ করেননি শাহিন আফ্রিদি? মহম্মদ রিজওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরেননি হার্দিক পাণ্ডিয়া?
ধরেছেন। ধরতেন। মাঠে কেউ কাউকে ছাড়তেন না এঁরা। বরং উদ্যত হতেন একে অন্যের চোয়ালে নকআউট পাঞ্চ বসিয়ে দিতে। কিন্তু বাইশ গজের যুদ্ধ শেষে দিল্লি আর পিণ্ডির সীমান্ত-উত্তেজনা ধুয়েমুছে যেত। প্লেয়াররাই দিতেন। আজকাল যা আর ভাবাই যায় না।
আসলে পহেলগাঁও সন্ত্রাস আর তার পরিণতিতে ভারত-পাক সীমান্ত সংঘর্ষ দু’দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে তো বটেই। যতটুকু যা ক্রিকেট-দৌত্য পড়েছিল, তারও ‘শেষকৃত্য’ করে ছেড়ে দিয়েছে। পুরনো প্যয়ার-মহব্বতের গল্পই আর নেই। গত এশিয়া কাপে সূর্যকুমাররা পাকিস্তানি প্লেয়ারদের সঙ্গে হাত মেলাননি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পাক বোর্ড তথা এশীয় ক্রিকেট কাউন্সিল প্রধান মহসিন নকভির থেকে ট্রফি নেননি। প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পরে পাল্টার নামে পাকিস্তান যা শুরু করে, নির্জলা অসভ্যতা। হ্যারিস রউফরা ‘৬-০’ দেখাতে শুরু করেন! পাক বোর্ড প্রধান এশিয়া কাপ ট্রফি নিয়ে চম্পট দেন! টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেও বা কম নাটক হল নাকি? বাংলাদেশ বাদ গিয়েছে বলে, দুঃখে কাতর পাকিস্তান বলে বসল তারা ভারতের বিরুদ্ধে খেলবে না! কলম্বোয় টিম নামবে না! পরে শরমের মাথা খেয়ে নামল ঠিকই। শুধু আইসিসি-কে দিয়ে পুরনো কিছু সিদ্ধান্ত নতুন ভাবে লিখিয়ে। দিন কতক আগে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক দুঃখ করে বলছিলেন যে, মিডিয়াও এর দায় পুরোপুরি এড়াতে পারে না। ওয়াঘার দু’পারের মিডিয়াই সমান তালে যে যার দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্রমাগত হাওয়া দিয়ে চলেছে। ভারত-পাকিস্তান খেলাটার সাড়ে বারোটা বাজিয়ে।
অবশ্য ক্রিকেট সাংবাদিক আর করবেও বা কী? দিন পাঁচেক আগেও যে কেউ জানত না, ১৫ ফেব্রুয়ারি আদৌ ভারত-পাক শেষ পর্যন্ত হবে কি না? তা হলে সে রাজনীতির চাল বাদে আর লিখবে কী? আর পাকেচক্রে বর্তমানে এমনই দশা হয়েছে যে, খেলাটাই গৌণ হয়ে গিয়েছে। আসল হল ক্রিকেট-রাজনীতি। তার খবরাখবর সংগ্রহ। প্রেস কনফারেন্সেও যার আঁচ পড়ছে প্রভূত।
এশিয়া কাপে করমর্দন হয়নি। বিশ্বকাপে (T20 World Cup) হবে? ভারত-পাক দেখতে নকভি আসছেন কলম্বো। ভারতীয় বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে শৈত্য কাটাতে তিনি বসবেন?
মহারণের আগে। ছবি দেবাশিস সেন।
তবু ভাগ্যিস একখানা উসমান তারিক ছিলেন। অভিষেক শর্মাকে নিয়ে একটা দোটানা ছিল। নইলে ১৫ ফেব্রুয়ারি খেলাটাই আরও ম্রিয়মান হয়ে পড়ত। এখন অন্তত চর্চা-তালিকায় উসমান দুই, অভিষেকের সুস্থতা তিন নম্বরে রয়েছেন। এটুকু না থাকলে পুরোটাই দু’দলের ‘করমর্দন’ স্ট্র্যাটেজির করাল গ্রাসে চলে যেত। যাক গে। খবরাখবর প্রভৃতি লিখে ফেলা যাক। অভিষেকের খেলা উচিত রোববার। এ দিন দীর্ঘ সময় তিনি নেটে ব্যাটিং করলেন। তবে মনে হচ্ছে, ছ’ফুট চার ইঞ্চির উসমান তারিক গভীর চিন্তার উদ্রেক করেছেন ভারতীয় শিবিরে। নইলে খামোখা সূর্যকুমার যাদব শনিবার নেটে অবিকল উসমানের মতো রীতিমতো পজ-টজ দিয়ে সাইড আর্ম বোলিং করবেন কেন?
অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই, আজকের ভারত-পাকের কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনও ভারতীয় নন। অভিষেক শর্মা ব্যাট নামক অসি নিয়ে কচুকাটা করতে নেমে পড়লেও নয়। কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন পাকিস্তানি–উসমান। যাঁর বোলিংয়ের আদবকায়দা বিশ্বজুড়ে বিতর্কসভা বসিয়ে দিয়েছে। এ দিনই দেখলাম, আইসিসি'র একজন আম্পায়ার বলেছেন যে, উসমানের অ্যাকশনে কোনও গন্ডগোল নেই। মোটেও ‘চাক’ করেন না তিনি। আর ‘পজ’ অর্থাৎ বল রিলিজের আগে সামান্য থমকে যাওয়া, উসমানের স্বাভাবিক বোলিং অ্যাকশনের অঙ্গ। তবে তিনি যদি সেই বিলম্বের সময় বাড়ান, বা বন্ধই করে দেন, তখন আম্পায়ারের প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন। রবিচন্দ্রন অশ্বিন অতশত আবার ভাবতেই চান না। তাঁর সহজ নিদান–ডেলিভারি রিলিজের আগে উসমান ‘পজ’ দিলেই, ভারতীয় ব্যাটাররা সরে যাক! আম্পায়ারকে বলুক, সরি বুঝতে পারিনি ও কখন বলটা করবে। চলতে থাকুক না এভাবে। দেখা যাক না, কতক্ষণ ধরে বিলম্ব-ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করে যেতে পারেন উসমান!
এবং এটাই দস্তুর। এটাই হওয়া উচিত। কারণ, এটাই প্রকৃত ভারত-পাক। যেখানে ওয়াঘার দু’প্রান্তে ‘দুশমন’-দের নিয়ে অবিরাম কাটাছেঁড়া চলে। এপারে করেন অশ্বিনরা। ও পারে শোয়েবরা। আপাতত করমর্দন-রাজনীতির কাছে গো-হারা হারছেন। তবু দেখা যাক, রোববার খেলা শেষে অভিষেক-উসমানরা খেলা দিয়ে ভারত-পাক খেলাকে খেলায় ফেরাতে পারেন কি না? ওহ্, তাঁদের তো আবার দ্বিতীয় শত্তুরের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। বরুণদেবতা! যাঁর মতিগতি মোটেও ভালো ঠেকছে না! রবিবাসরীয় কলম্বোয় কিন্তু দেদার বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে, পুরোদস্তুর বজ্র-বিদ্যুৎ সহ।
আজ টিভিতে
ভারত বনাম পাকিস্তান
কলম্বো, সন্ধে ৭.০০
স্টার স্পোর্টস
