চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের 'নীরব নায়ক' কে? ভারতীয় ক্রিকেটের খবরাখবর রাখেন যাঁরা, উত্তরটা দিতে দু'দণ্ড সময় নেওয়ার কথা নয়। ছ'ফিট চার ইঞ্চির এক ছিপছিপে যুবক। যিনি লোয়ার মিডল অর্ডারে নেমে দিন-দিন ভরসা-বিশ্বাসের জপমন্ত্র হয়ে উঠছেন টিমের। ঠিক শিবম দুবে (Shivam Dube)।
ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ। গত এশিয়া কাপ ফাইনাল। এবারই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচ। বিগত এক-দেড় বছরে খুঁজলে এ রকম একাধিক উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেখানে 'নীরব নায়কের' কাজটা করে গিয়েছেন শিবম। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় যাকে বলে 'আনসাং হিরো'। আহা, ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে 'ভার্চুয়াল' কোয়ার্টার ফাইনালই ধরুন। হার্দিক পাণ্ডিয়া যে সময় আউট হন, ১০ বলে ১৭ প্রয়োজন ছিল ভারতের। শিবম সবে নেমেছিলেন। দু'টো বল আটকে গেলে, ভারতের উপর ঈষৎ চাপ তৈরি হতে পারত। কিন্তু মুম্বইকর কুঁকড়ে যাননি। উল্টে পরপর দু'টো বাউন্ডারি মেরে সম্ভাব্য জয়ের রাস্তা খুলে দেন। শিবমের সেই সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকরী ইনিংসের মুক্তকচ্ছ প্রশংসা করে যান গুরু গৌতম গম্ভীরও।
অথচ শিবমের ছেলেবেলার ছবি দেখলে, বিশ্বাস করা কঠিন যে এ ছেলে আজ ভারত খেলছে! আর নিছক ভারত নয়। সোজা বিশ্বকাপ খেলছে! গোলগাল চেহারা। বেশ মোটাসোটা। ফুলো-ফুলো গাল। ছোটবেলায় যাঁর একটাই নেশা ছিল-খাওয়া! পরিণাম হিসেবে, পাল্লা দিয়ে বেড়ে গিয়েছিল ওজন। আন্ধেরির হংসরাজ মোরারজি পাবলিক স্কুলে পড়তেন শিবম। সেই স্কুলের কোচ বর্তমানে মুম্বই ক্রিকেট সংস্থার যুগ্ম সচিব নীলেশ ভোঁসলে! বুধবার নিজের অফিসে বসে ভোঁসলে সাহেব 'সংবাদ প্রতিদিন'-কে বলছিলেন, "আজ ভাবলে হাসি পেয়ে যায়। জানেন, খেলতে নেমে একটা রান পর্যন্ত ঠিক করে নিতে পারত না শিবম? খেয়ে-খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিল।" শোনা গেল, দেদার 'পাও-ভাজি', 'বড়া পাও' সাঁটিয়েও ছোট থেকে একটা কাজ খুব ভালো পারতেন শিবম। তা হল, প্রচণ্ড জোরে বলকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া। ছাত্রের কাছে কোচ নীলেশ একটা আবেদন রাখতেন মাত্র-'যা-ই করিস বাবা, তিরিশটা বল শুধু খেলে দে। তুই তিরিশটা বল খেললে, আমাদের কাজ হয়ে যাবে!'
তা, গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে গোটা তিরিশেক ডেলিভারি খেলতেন শিবম। বোলারকে ফালাফালা করার 'গুরুদায়িত্ব' পালন করতেন। "আজ শিবমের ফিটনেস দেখলে বিশ্বাসই হয় না, ছোটবেলায় দৌড়তে পারত না। এখন তো শুনি, খাওয়াদাওয়া নিয়ে অসম্ভব ডিসিপ্লিনড। পাও-ভাজি ইত্যাদি কবে ছেড়ে দিয়েছে," বলার সময় হাসতে থাকেন এমসিএ যুগ্ম
সচিব। পুরনো ছাত্রকে নিয়ে কোথাও একটা প্রচ্ছন্ন গর্বও কাজ করে যেন। উৎফুল্ল ভাবে বলেন, "জানেন, শিবম কখনও জুনিয়র পর্যায়ে খেলেনি। মুম্বই প্রিমিয়ার লিগ। রনজি। ইন্ডিয়া।"
তবে শিবম অ্যাদ্দুর আসতে পারতেনই না, যদি তাঁর পিতা রাজেশ দুবের অসীম আত্মত্যাগ তাতে মিশে না থাকত। ভালো ব্যবসা করতেন রাজেশ। কিন্তু ছেলেকে ক্রিকেটার তৈরি করবেন বলে, ব্যবসা প্রায় লাটে তুলে দিয়েছিলেন। আর্থিক ক্ষতি একটা সময় এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল যে, কী ভাবে আর টানবেন, বুঝে পেতেন না। নীলেশ বলছিলেন, "পিঠে একবার বড় চোট লাগে শিবমের। তার পর খেলাই ছেড়ে দিয়েছিল। ছেলের প্র্যাকটিসে যাতে অসুবিধে না হয়, সেই জন্য বাড়িতে টার্ফ তৈরি করে দিয়েছিলেন রাজেশ ভাই। একটাই স্বপ্ন ছিল ওঁর। ছেলে দেশের হয়ে খেলবে।" তা খেলছেন শিবম। পিতার স্বপ্নপূরণ করেছেন। আজ যিনি ওয়াংখেড়েতে নামবেন। ঘরের মাঠে, দেশকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলতে। একদিক থেকে ঠিকই আছে। ক্রিকেটের কোন সাফল্যের কাহিনিতে শ্রমের ঘাম-রক্ত মিশে থাকে না? এ শহরেই যুবক যশস্বী জয়সওয়াল দিনের পর দিন মশার কামড়ের 'রাজশয্যায়' ময়দানি তাঁবুতে রাত কাটাননি?
