'কার্লোস ব্রেথওয়েট, কার্লোস ব্রেথওয়েট রিমেম্বার দ্য নেম... হিস্ট্রি ফর দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ...।'
দশ-দশটা বছর। একশো কুড়ি মাস। তিন হাজার ছ'শো বাহান্ন দিন। বিগত এক দশকে বিবিধ পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে এ পৃথিবীতে। আর্থ। সামাজিক।
খেলাধুলো। সর্বত্র। সে দিক থেকে ইয়ান বিশপ এক ব্যতিক্রমী চরিত্র বটে। ব্যতিক্রমী তাঁর ব্যারিটোন। অ্যাদ্দিন পরেও তা যে পুরনো হল না! দশ বছর পরেও তা একই রকম টাটকা। তাজা।
কে ভুলতে পেরেছে, ইডেনে দশ বছর পূর্বের এক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ ওভারে ব্রেথওয়েটের দানবীয় চার-চারখানা ছয়? কে ভুলতে পেরেছে, সেই ছয়ের বর্ষণ-সিক্ত বেন স্টোকসের অপমানের লাল মুখ? কে ভুলতে পেরেছে, উত্তেজিত বিশপের গলার শিরা ফুলিয়ে সেই প্রাণান্ত চিৎকার, 'কার্লোস ব্রেথওয়েট, কার্লোস ব্রেথওয়েট, রিমেম্বার দ্য নেম...?'
কে ভুলতে পেরেছে, সেই ছয়ের বর্ষণ-সিক্ত বেন স্টোকসের অপমানের লাল মুখ? কে ভুলতে পেরেছে, উত্তেজিত বিশপের গলার শিরা ফুলিয়ে সেই প্রাণান্ত চিৎকার, 'কার্লোস ব্রেথওয়েট, কার্লোস ব্রেথওয়েট, রিমেম্বার দ্য নেম...?'
নাহ্, দশ বছর পর ইডেনের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বিশপ আসছেন না। অন্তত শনিবারের ইডেনে তিনি নেই। হারারেতে অনূর্ধ্ব উনিশ বিশ্বকাপ ফাইনালের কমেন্ট্রি করেছেন শুক্রবার। আসবেন কী ভাবে? তবে শুনলাম, ব্রেথওয়েট আসছেন। আইসিসি-র কমেন্ট্রি টিমের হয়ে কাজ করতে। সিএবি মোটামুটি একটা পরিকল্পনা ছকে রেখেছে, হয় ব্রেথওয়েট, নইলে মাইক আথারটন, যে কোনও একজনকে দিয়ে ইডেন বেল বাজানোর। ব্রেথওয়েট দেখলাম, এ দিন বিশপের সেই ঐতিহাসিক ধারাভাষ্য-স্মৃতিচারণ করে রেখেছেন একপ্রস্থ। বলে রেখেছেন যে, "দশ বছর আগে ইডেনে অমর হয়ে গিয়েছিল বিশপের ধারাভাষ্য। ভেবে গর্বিত লাগছে যে, আমি এবার সেই কমেন্ট্রিবক্সে বসতে পারব।” সে ঠিক আছে না হয়। শুধু বুঝতে পারছি না, শনিবার ইডেনে আসিয়া ব্রেথওয়েট দেখিবেন কী? কাহারেই বা দেখিবেন?
শনিবার ইডেনে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির প্রথম ম্যাচ। মাঠজুড়ে ব্র্যান্ডিং চলছে। ডিজে জগঝম্প শান দিয়ে রাখতে ব্যস্ত। দুপুরের দিকে আবার পুলিশের বিশাল বাহিনী ইডেন টহল দিয়ে গেল। কিন্তু প্রাণ কোথায়, প্রাণ?
লোক কোথায়, লোক?
শুনলাম, শনিবারের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম স্কটল্যান্ড ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছে হাজার তিনেক। সোমবারের ইটালি বনাম স্কটল্যান্ডের আরও শনির দশা-সাড়ে তিনশো! সিএবি তবু স্কুল-টুলের ছাত্র উপস্থিত করে শনিবারটা সামাল দেওয়ার কথা ভেবে রেখেছে। তার পরেরটা কেউ জানে না। অতএব, দশ বছর আগে ব্রেথওয়েটের চাক্ষুষ করা 'ফুলহাউস ইডেন গার্ডেন্স' দেখার কোনও সম্ভাবনাই নেই।
সোমবারের ইটালি বনাম স্কটল্যান্ডের আরও শনির দশা-সাড়ে তিনশো! সিএবি তবু স্কুল-টুলের ছাত্র উপস্থিত করে শনিবারটা সামাল দেওয়ার কথা ভেবে রেখেছে। তার পরেরটা কেউ জানে না। অতএব, দশ বছর আগে ব্রেথওয়েটের চাক্ষুষ করা 'ফুলহাউস ইডেন গার্ডেন্স' দেখার কোনও সম্ভাবনাই নেই।
অবশ্য, দর্শককে দোষ দেওয়াও যায় না। লোকে দেখতে আসবে কাকে? এক মাস আগেও স্কটল্যান্ড জানত না, তারা বিশ্বকাপ খেলছে। গোঁয়ার্তুমি করে বাংলাদেশ 'অর্ধচন্দ্র' না পেলে যে সুযোগ স্কটিশদের সামনে আসত না। তা ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও দারুণ আহামরি নয় মোটে। ২০১৬-র বিশ্বজয়ী টিমের দু'জন পড়ে রয়েছেন শাই হোপ নেতৃত্বাধীন বর্তমান দলে-জনসন চার্লস ও জেসন হোল্ডার। এবং অধুনা ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ যিনি, সেই ডারেন স্যামি। যিনি দশ বছর আগে ইডেনের ঐতিহাসিক ফাইনালের অধিনায়ক ছিলেন! টুকটাক শক্তিশালী নাম আছে গোটা কতক। পাওয়েল। হেটমায়ার। শেফানে রাদারফোর্ড। হোপ স্বয়ং। কিন্তু তাঁরা পরিচিত ক্যারিবিয়ান-জ্যোতি সরবরাহে যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত কি? কে জানে। বিশ্বজয়ীর সম্ভাব্য বিচ্ছুরণ প্রভৃতিতে না হয় পরে আসা যাবে।
তা, স্যামি এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে ঢুকলেন গাইতে-গাইতে। আরাম করে চেয়ার টেনে বললেন, "আহ্, ইডেন গার্ডেন্স। সো মেনি মেমোরিজ। তবে আমি কিন্তু দশ বছর আগে বিশ্বকাপ জিতে মার্লনের (মার্লন স্যামুয়েলস) মতো টেবলে পা তুলে প্রেস কনফারেন্স করিনি।" প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলরাউন্ডারের মধ্যে বরাবরই একটা 'শো-স্টপার' গোত্রীয় ব্যাপার রয়েছে। খেলা ছাড়ার পরেও যা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। স্মিত হাস্য, ঈষৎ হিসহিসে গলায় স্যামি বলছিলেন, "২০১৬-র সঙ্গে এবারের টিমটার অনেক মিল। সে বারও কেউ ভাবেনি আমরা বিশ্বজয়ী হব। এবারও তাই।"
ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ খতিয়ান দিচ্ছিলেন যে, কী ভাবে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একচেটিয়া সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সঙ্গে বললেন যে, টিমের সামনে একটা অদৃশ্য চাঁদমারিও বেঁধে দিয়েছেন। বলে রেখেছেন, ভারতে বিশ্বকাপ জিততে গেলে, ভারতকে টুর্নামেন্টে কখনও না কখনও হারাতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল, এটা ২০২৬। ২০১৬ নয়। টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন আর রাজত্ব করে না। বরং নেপালের কাছে পর্যন্ত তারা হারে। 'অজ্ঞাতকুলশীল' স্কটল্যান্ড পর্যন্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে যায়, "ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আগেও হারিয়েছি। আবারও হারাতে পারি।" স্যামি তবু মানেন না। টানা-টানা গলায় শুনিয়ে যান, "ইউ কান্ট টক অ্যাবাউট ক্রিকেট, ইফ ইউ ডোন্ট টক অ্যাবাউট ওয়েস্ট ইন্ডিজ। উই আর গ্রিন মেরুন, উই আর হিয়ার টু উইন, উই আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ, লেট দ্য ডান্স বিগিন!"
লেট ইট বিগিন। হোক শুরু। প্রার্থনা চলুক ক্যালিপসো-মূর্ছনার। একখানা ভারত ম্যাচ আর একটা ভারত-বিহীন সম্ভাব্য সেমিফাইনাল বাদে, বিশ্বকাপে ইডেনের আর আছেটাও বা কী?
