চার্চ গেট থেকে ট্রেনে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগবে ভিরার পৌঁছতে। সেখান থেকে ডি’সিলভা নগর পৌঁছতে আরও মিনিট চল্লিশ সময় লেগে যাবে। অদ্ভুতরকমের শান্ত জায়গাটা। দেখে একবারের জন্য মনে হবে না বারো ঘণ্টা আগেও কী উৎসব চলেছে! ক্যাব ড্রাইভার বলছিলেন, শুক্রবার সারা রাত উৎসব চলেছে। ঘরের ছেলে বিশ্বকাপ জিতেছে বলে কথা!
ডি’সিলভা নগর বাসস্টপ থেকে একটু এগোতেই বাড়িটা। সামনের আয়ুষ মাত্রের কাকারা থাকেন। পিছনের দিকটা আয়ুষদের। বাড়িতে ঢুকতেই বিশাল ঘর। যেখানে তাঁর ক্রিকেট জার্নি শুরুর থেকে বর্তমান স্মারকের ভান্ডার। সামনে ছবিতে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে আয়ুষ। আসলে কাপ জেতার স্বপ্নটা অনেক আগে থেকেই দেখতে শুরু করেছিলেন। ছবিটা বারবার দেখতেন আর জয়ের প্রতিজ্ঞা করতেন।
আয়ুষের পিতা যোগেশ মাত্রের বারবার দু’বছর আগের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেবার চ্যালেঞ্জারের টিমে জায়গা হয়নি। যার ফলে আর বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি আয়ুষ। কিন্তু ছেলে যাতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন, প্রত্যেকটা মুহূর্তে উৎসাহিত করে যেতেন বাবা-দাদুরা। আয়ুশের পিতা বলেছিলেন, চিন্তা করিস না। শুধু নিজের খেলাটা খেলে যা। দেখবি পরের বিশ্বকাপ ঠিক খেলবি। আর শুধু খেলবি নয়। ক্যাপ্টেন হিসেবে ট্রফিটা জিতবি। স্বপ্নপূরণের পর তিনি বলছিলেন, “দুবছর আগে ওকে এই কথাটা বলেছিলাম। যাতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, তার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলাম। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হল।”
অবশ্য আয়ুষের পিতা চেয়েছিলেন ছেলেকে সঙ্গীত জগতে নিয়ে আসতে। আয়ুষের বয়স তখন দুই কিংবা তিন হবে। যোগেশ হারমোনিয়াম থেকে শুরু করে নানা বাদ্যযন্ত্র কিনে এনেছিলেন। আয়ুষের গানের প্রতি আকর্ষণও ছিল। কিন্তু হঠাৎই যোগেশ আবিষ্কার করলেন, ছেলে চার বছর বয়সেই বিশাল ছক্কা হাকাচ্ছে। একদিন এমন একটা ছক্কা মারলেন যে পাশের মাঠে বল গিয়ে পড়ে। তখনই ঠিক করে নেন, ছেলেকে ক্রিকেটার তৈরি করতে হবে। স্থানীয় এক কোচিং সেন্টার ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন, ওখানে থাকলে উন্নতি হবে না।
অবশ্য আয়ুষের পিতা চেয়েছিলেন ছেলেকে সঙ্গীত জগতে নিয়ে আসতে। আয়ুষের বয়স তখন দুই কিংবা তিন হবে। যোগেশ হারমোনিয়াম থেকে শুরু করে নানা বাদ্যযন্ত্র কিনে এনেছিলেন।
নেট ঘেঁটে দিলীপ বেঙ্গসরকার ক্রিকেট অ্যাকাডেমির কথা জানতে পারেন। বয়স কম থাকায় সেই অ্যাকাডেমি ভর্তি নিতে চায়নি। বরং দু'বছর পরে যোগাযোগ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নাছোড় আয়ুশের পিতা। সেখানকার কোচকে বারবার অনুরোধ করেন, যেন নেটে একবার তাঁর ছেলেকে দেখা হয়। আয়ুষকে প্রথমবার নেটে দেখার পর অবাক হয়ে যান সেখানকার কোচেরা। মাত্র ছ'বছর বয়সেই অসম্ভব পরিণত ব্যাটিং-বোধ। দ্রুত ভর্তি করে নেওয়া হয়। তারপর একটা ইনট্রা স্কোয়াাড ম্যাচে বেঙ্গসরকার নিজে আয়ুষের ব্যাটিং দেখছিলেন। টিম ১০৭ রানে অলআউট হয়ে যায়। যার মধ্যে আয়ুষ করে ৬৭। প্রথমদিনই বেঙ্গসরকার বুঝেছিলেন, ভারতীয় দলে খেলার রসদ আছে ছেলেটার মধ্যে। তাই বলে দিয়েছিলেন, কোনওভাবেই যেন আয়ুষের ব্যাটিং গ্রিপ না বদলানো হয়।
লড়াইটা একেবারেই সহজ ছিল না। ছয়-সাত বছরের একটা ছেলের প্রত্যেক দিন চার ঘণ্টা করে জার্নি। এখানেও একটা সমস্যা দেখা যায়। মুম্বইয়ে প্র্যাকটিসের জন্য প্রত্যেক দিন নিয়ে কে আসবে? চাকরি ছেড়ে সেটা আয়ুষের বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। নাতির ক্রিকেটের উন্নতির জন্য এগিয়ে আসেন আয়ুষের দাদু। চাকরি থেকে অবসরের পর প্রত্যেকটা দিন তাঁকে নিয়ে ৮০ কিলোমিটার জার্নি করতেন। ধীরে ধীরে স্কুল ক্রিকেট শুরু। সেখানেও একইরকম দাপট।
জুনিয়র পর্যায়ে খেলার সময় থেকেই মুম্বই ক্রিকেট আয়ুষকে একটা নামে ডাকতে শুরু করে দেয়– ছোটা রোহিত। রোহিত শর্মার একেবারে অন্ধ ভক্ত আয়ুষ। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংস থেকে ডাক পাওয়ায় হয় আরও এক স্বপ্নপূরণ। তবে দেশের হয়ে বিশ্বজয় সবার থেকে আলাদা। রবিবার বাড়ি ফিরবেন আয়ুষ। বিশ্বজয়ীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য তৈরি পুরো ভিরার।
