shono
Advertisement

বয়স কি কেবল লুকিয়ে থাকে হৃদয়-মন-শরীর এবং ক্যালেন্ডারে

শরীর চলে নিজের তালে, জীবন চলে যাপনের ছন্দে।
Posted: 04:45 PM Jul 21, 2023Updated: 04:45 PM Jul 21, 2023

বয়স কেবল চুলের পাকে বা দাঁতের ফাঁকে বা হাড়ের বাঁকে লুকিয়ে থাকে না। বয়স লুকিয়ে থাকে হৃদয়-মন-শরীর এবং ক্যালেন্ডারে। শরীর চলে নিজের তালে, জীবন চলে যাপনের ছন্দে। যারা এই উপলব্ধি নিয়ে বাঁচতে পারে তারা-ই পরিণত। কলমে সিদ্ধার্থ বিশ্বাস

Advertisement

ভাবা যাক, বয়স কাকে বলে। একসময় গানওয়ালা যেমন বলেছিলেন, ‘বয়স আমার মুখের রেখায়’। আর তার সঙ্গে দিয়েছিলেন বয়স্কতার অন্য নজিরের তালিকা। তেমনই জরাজীর্ণতা আর টানটান যৌবনের প্রস্থান নিয়ে রোম‌ান্টিক কান্নাকাটি দিয়ে বোঝাই উপাখ্যান, লুকিয়ে রাখে মৃত্যুভয়। অস্তিত্ব কিন্তু আসল সমস্যা নয়। বিজ্ঞান প্রমাণ করে (ও বেশ কয়েকটা ধর্ম নানা আঙ্গিকে পেশ করে) যে, পদার্থ অবিনশ্বর। অবশ্য পৃথিবী বারে বারে প্রমাণ করেছে, অপদার্থও অবিনশ্বর। পদার্থ আর শক্তির সামঞ্জস্য আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ধারণার মূল আধার।

সমস্যা আসলে আত্মচেতনা নিয়ে। আত্ম ও অহংবোধ- আমাদের মানবরূপের অস্তিত্বকেই স্বীকার করে। চেতনার অন্তকেই অবচেতন সযত্নে অস্বীকৃতির মাধ্যমে চিন্তন থেকে দূরে ঠেলে দেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য হল, এই চেতনার সঙ্গে মানবিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। অবশ্য মানুষের বা মানুষের ইতিহাসের সঙ্গেই বা মানবিকতার কতটা সম্পর্ক!

‘কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’-র থেকে একটু সরে এসে বয়সের ব্যাপারে ফিরে আসি। জসীমউদ্দিনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর রুপাই-সাজুও তো বয়সের শিকার হওয়ার সুযোগ পায়নি। “কল্কাপেড়ে শাড়ি প’রে কোন এক সুন্দরীর শব” কি আর “চন্দন চিতায় চড়ে” না? তাই যদি শৈশবের সেই প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যায়, ‘বয়স কয় প্রকার ও কী কী?’- তাহলে উত্তরটা কেমন হবে? অবশ্য আপনারা বলতে পারেন, বয়স তো দু’-রকমের, শরীর আর মনের। আমি আর-একটু বাড়াব। বয়স অন্তত তিনরকমের। শরীরের, মনের আর ক্যালেন্ডারের। শেষটা সবচেয়ে সহজ। মানুষের তৈরি সময়ের হিসাব, যা সাল-তারিখ-ঘড়িতে বাঁধা, তা অনুযায়ী প্রতি জীবিত ও মৃতের অস্তিত্বের বয়স ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আপনারা বলবেন, এটাই তো শরীরের বয়স! এ আবার আলাদা করে বলার কী আছে? আমি তা মানব না। অবশ্যই আলাদা করে বলার আছে।

শরীরের সঙ্গে (মনের প্রভাব থাকুক বা না থাকুক) সময়ের সমীকরণ সহজে মেলার নয়। এমন কোনও সুখী মানুষ যদি থাকে, যার সঙ্গে ক্যালেন্ডারের পরিচয় নেই, সে কি জানে তার বয়স বাড়ছে কি না? সে নিজেকে এই সবে না বেঁধে হয়তো দিব্যি তরুণ হয়ে কাটাতে পারে সারাজীবন! সে তার নিজস্ব দিনপঞ্জিকা লিখে যেতে পারে সময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তবে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ঝগড়া করে আজ অবধি কেউ জেতেনি। বরং কেউ কেউ পায়েস-কেক, মোমবাতি-হল্লা নিয়ে ভালই পার করেছেন সেই দিনগুলো, যা তাদের বয়ঃক্রম বৃদ্ধির দিন হিসাবে সরকারি নথিবদ্ধ।

কিন্তু ক্যালেন্ডারের বয়সের সঙ্গে সবার শরীর একভাবে পাল্টায় না। অনেকের শরীর সক্ষম হয় তাড়াতাড়ি। এমন নয় যে, তাদের‌ই শরীর আবার অক্ষম‌ও হবে তাড়াতাড়ি। আবার কেউ কেউ সক্ষম হতে অক্ষম হয় সারা জীবন। প্রতিটি জীবন এগয়-পিছয় তার নিজের ছন্দে। কেউ কেউ ৬০ বছরে অবসর চায়, কেউ কেউ ৭০, কেউ কেউ আরও সত্ত্বর। অবশ্য কর্মক্ষমতা বা পারদর্শিতার সঙ্গে এই দিনাঙ্কের কোন‌ও যোগাযোগ নেই। বয়স সবার বাড়ে, কিন্তু মনের পরিপূর্ণতা কি সবাই পায়?

অনেকেই ৬০-এও সক্ষম‌ হয়েই উঠতে পারে না, আবার অনেকে ৮০-তে এসে পাহাড়-প্রীতি আবিষ্কার করে। কেউ কেউ অবসরের অবসাদে ফাঁসতেই চায় না। শরীর চলে নিজের তালে, জীবন চলে যাপনের ছন্দে। আবার বংশগতির বেগতিক প্রবণতা আনে আকস্মিক ছন্দপতন। বৃদ্ধ বয়সে প্রেম অনেককে পথভোলা পথিকে পরিণত করে। পরিণয় রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবের থেকে আলাদা নয়– যারা এই উপলব্ধি নিয়ে বাঁচতে পারে, তারা পরিণত। আর অনেকে অবশ্য তাদের পরিণয়-জীবনকেই চূড়ান্ত মনে করে। পড়ি-মরি করে আর কত দিন চলা যায়!

শরীরের যত ক্রোনোলজি বাড়ে (কঠিন বাংলায় কালানুক্রম), তত তার যুদ্ধ বাড়ে মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে। শরীরের স্থিতিস্থাপকতা (সোজা বাংলায় ইলাস্টিসিটি) যত কমে, তত মাটির টান বাড়তে থাকে। দেহের সেই টানটান ভাব আর থাকে না। অনেক কিছুর প্রতি টানও কমতে থাকে। আর সমাজ-সংস্কৃতি-সৌন্দর্যকে এমন ভাবে তারুণ্যের টানে বেঁধে রাখে, প্রবীণ বিনা দোষে হয়ে ওঠে ব্রাত্য। সমাজ জরাকে কুৎসিত বলতে শেখায় প্রাথমিক স্তর থেকেই।

প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি গার্হস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসের কথা বলে বটে এবং তার সময়সীমাও বেঁধে দেয়। কিন্তু ঠিক ২৫-৫০-৭৫- এই হিসাবটা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অবসরের বয়সের যেমন প্রতিসরণ ঘটে রাজনীতি-বিশেষে, তেমনই শরীর-বিশেষে শরীর জানায়, শরীরের কবে অবসর প্রয়োজন। গায়ের জোর যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণই গায়ের জোরে সবকিছু করা যায়, তারপর হয়তো কিছুদিন মনের জোরে কাজ চলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জরার জোর মানুষকে জর্জরিত করবেই।

[আরও পড়ুন: কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কি সংবিধানসম্মত?]

সেজন্য চেতনার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শরীর সম্পর্কের সচেতনতার বিকাশও প্রয়োজন। বয়স কেবল চুলের পাকে বা দাঁতের ফাঁকে বা হাড়ের বাঁকে লুকিয়ে থাকে না, বয়স লুকিয়ে থাকে হৃদয়-মন-শরীর এবং ক্যালেন্ডার- সব মিলিয়েই। বয়স যেমন বয়সের বোধই দেয়, তেমনই মন-শরীরের সফল সমীকরণ দিতে পারে পরম তৃপ্তি। যারা পর্বতশৃঙ্গে ওঠে, তারা জানে, সেখান থেকে একসময় নেমে এসে শুরুর ঠিকানাতেই ফিরে আসতে হবে। সেরকমই মন-শরীর-ক্যালেন্ডার এমন একটা জীবনশিখরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে নেমে আসাটাও আনন্দের হতে পারে। আর সবাই ইয়েটস সাহেবের মতের মতো বার্ধক্যের শ্যেন বুদ্ধি লাভ করেন না! ‘কীর্তন ভাসান গান রুপকথা যাত্রা পাঁচালীর নরম নিবিড় ছন্দে…’ পরিবর্তন আসে, কিন্তু তা থামে না।

অনেক ধর্ম অবশ্য নানারকম আনন্দের কথা বলে। তার সঙ্গে মনে রাখা দরকার, জমানোর আনন্দর থেকে খরচার আনন্দ বেশি। শুধু জমিয়ে গেলে কৃপণ হয়েই থেকে যেতে হয়। জীবনের ক্ষেত্রে সেই কার্পণ্য বাতুলতা ছাড়া কিছু না এবং শেষ মুহূর্তের ক্ষেদোন্মত্ততা নিতান্তই বিফলতার প্রতীক।সুখ-দুঃখের কথা নিয়ে প্রাণ জুড়িয়ে নেওয়াটাও নিতান্ত প্রয়োজন। তাই বয়স যখন মুখের রেখায় আসে, তখন একটু চিন্তা করা ভাল, বয়সের রেখা আর রেখার বয়সের রহস্য নিয়ে।

[আরও পড়ুন: ছাড়ের হার বাড়ালেই কি বাজার ধরা যায়? বিপণির সজ্জা নিয়ে উদাসীন বাঙালি প্রকাশকরা]

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

Advertisement