shono
Advertisement
INDIA alliance

দাবি-দাওয়ার ভিড়ে লক্ষ্যহীন ‘ইন্ডিয়া ২.০’, নাগপাশে বন্দি বিরোধী জোটের পরিত্রাণ কোন পথে?

‘ইন্ডিয়া’ জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি তাঁকে যথাযথভাবে সমন্বয়কের ভূমিকা দেওয়া হত, তাহলে হয়তো ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ ভিন্ন হলেও হতে পারত। কিন্তু কৌশলগত চিন্তার বদলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াই প্রাধান্য পায়।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 04:35 PM Jun 12, 2026Updated: 04:35 PM Jun 12, 2026

ইতিহাস খুব কম দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। ২০২৯ সালের একটাই প্রশ্ন– ইন্ডিয়া কি পুরনো জোটকে নতুন মোড়কে সাজিয়ে আবারও ভাগ্য পরীক্ষার চেষ্টা করবে? লিখছেন, রাজদীপ সরদেশাই

Advertisement

ভারতীয় সিনেমায় সিক্যুয়েল খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়। তার কারণ, দর্শকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ছবিটি আগেই দেখে ফেলেন, ফলে নতুনত্বের আকর্ষণ ফিকে হয়ে যায়, আর গল্পও অনেক সময় পুরনো ও ক্লান্ত লাগে। তবে ব‌্যতিক্রম নেই এমন নয়– যেমন সাম্প্রতিক ব্লকবাস্টার ‘ধুরন্ধর’। অধিকাংশ সিক্যুয়েল প্রথম ছবির সাফল্যের ক‌্যারিশমা এরকম জিইয়ে রাখতে পারে না!

এই একই কারণে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে অপ্রত্যাশিতভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নতুন সংস্করণ– ‘ইন্ডিয়া ২.০’ নিয়ে বিশেষ আশাবাদী হওয়ার কারণ আমি দেখি না। এর আরও একটি কারণ, গত দুই বছরে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গিয়েছে।

কংগ্রেস একের-পর-এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচনে ধাক্কা খেয়েছে। জোটের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠা বহু আঞ্চলিক দলও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস বিপর্যস্ত। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) ও শরদ পওয়ারের ‘এনসিপি’ বিভক্ত। দিল্লি হারানোর পর ‘আম আদমি পার্টি’-ও নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে লড়ে যাচ্ছে। চুম্বকে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধী দলগুলো যেন ক্ষমতায় আসার চেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামেই বেশি ব্যস্ত।

আঞ্চলিক ভিত্তিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোট গড়ে উঠেছিল বিজেপিকে প্রতিহত করতে। কিন্তু নতুনভাবে পরিকল্পিত একটি কংগ্রেস-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিসর– যেখানে কংগ্রেস থাকবে কেন্দ্রে, আর শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতারা থাকবেন বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসাবে, পাশা উলটে দিতে পারে। 

আপাতদৃষ্টিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোট এখন এমন একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত, যাদের ঐক্যের ভিত্তি কোনও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নয়; বরং ২০২৯ সালে নরেন্দ্র মোদিকে পরাস্ত করার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু রাজনীতি তো কেবল সংখ্যার খেলা নয়; রসায়নেরও বিষয়। নির্বাচনী জোট কনফারেন্স রুমের চার দেওয়ালের অন্দরে তৈরি করা যায়, কিন্তু ভোটাররা সুযোগসন্ধানী রাজনীতিকে সহজেই চিনে ফেলে। মাত্র কয়েক মাস আগেও রাহুল গান্ধী তৃণমূল কংগ্রেসকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে আক্রমণ করেছিলেন– বিজেপির সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ তুলে। এখন কি সেই নেতারাই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভোটারদের কাছ থেকে বিশ্বাস আশা করতে পারেন?

বিরোধী শিবিরের অভ‌্যন্তরীণ অসংগতিসমূহ স্পষ্ট। তামিলনাড়ুর নির্বাচনী ফলাফলের পর ডিএমকে মনে করছে, কংগ্রেস তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। পাঞ্জাবে কংগ্রেসই আম আদমি পার্টির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, ফলে তারা কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আগ্রহী নয়। কেরলমে কংগ্রেসের আক্রমণে বামপন্থীরা ক্ষুব্ধ। এই পরিস্থিতিকে কোনওভাবেই একটি সুসংহত ‘রাজনৈতিক বিকল্প’ বলা যায় না। এসবের মাঝে বিজেপি অন্তত খানিকটা হলেও স্পষ্টতা প্রদান করতে সমর্থ। কেউ তাদের আদর্শের সঙ্গে একমত হোক বা না হোক, ভোটাররা জানে– দলের নেতৃত্ব কার হাতে, তারা মূলত কী বিশ্বাস করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোথায় কেন্দ্রীভূত। বিজেপির আধিপত্য শুধু নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার ফল নয়; বিরোধীদের বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও তার অন্যতম কারণ। তাই বিরোধীদের প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অবলম্বনের।

আমার মতে, ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার আগে কংগ্রেসের নিজস্ব প্রাচীন রাজনৈতিক পরিসর বা ‘কংগ্রেস ইকোসিস্টেম’ পুনর্নির্মাণের কথা ভাবা উচিত। ভারতীয় রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য সত্য হল, বর্তমানের বহু আঞ্চলিক দলের জন্মই কংগ্রেস পরিবার থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তৃণমূল কংগ্রেস’, শরদ পওয়ারের ‘ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি’ কিংবা জগনমোহন রেড্ডির ‘ওয়াইএসআর কংগ্রেস’– সবক’টির শিকড় কংগ্রেস। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তারা পৃথক পথে হাঁটলেও আদর্শগতভাবে তারা এখনও অনেকাংশে একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ। সে-কারণেই তাদের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ে এখনও কংগ্রেসের ছাপ রয়ে গিয়েছে। গত চার দশকে কংগ্রেস পরিবার নানা আঞ্চলিক শক্তিতে বিভক্ত হয়েছে। এর ফলে বিজেপি-বিরোধী ভোট ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভক্ত হয়েছে।

‘ইন্ডিয়া’ জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার আগে কংগ্রেসের নিজস্ব প্রাচীন রাজনৈতিক পরিসর বা ‘কংগ্রেস ইকোসিস্টেম’ পুনর্নির্মাণের কথা ভাবা উচিত। ভারতীয় রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য সত্য হল, বর্তমানের বহু আঞ্চলিক দলের জন্মই কংগ্রেস পরিবার থেকে।

তাহলে আর-একটি ভঙ্গুর বিজেপি-বিরোধী জোট গঠনের পরিবর্তে কেন এই কংগ্রেস-উদ্ভূত শক্তিগুলোর বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা হবে না? পূর্ণাঙ্গ একীভবন হোক বা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক ঐক্য– এটি নির্বাচনের আগে তড়িঘড়িতে তৈরি করা আরেকটি জোটের তুলনায় কংগ্রেসকে অনেক বেশি শক্তিশালী করতে পারে। এতে বিরোধী রাজনীতিতে একটি সুদৃঢ় কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব এবং কংগ্রেস ছোট দলগুলোর সঙ্গে দুর্বল অবস্থান থেকে নয়, শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনা করতে পারবে। এখন এই ধারণা অবাস্তব বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করার শিল্পের নাম রাজনীতি। বিজেপিও তো কয়েক দশক ধরে বৃহত্তর সংঘ পরিবারের ধৈর্যশীল সংগঠনের ফল। তাহলে কংগ্রেস পরিবার কেন চিরকাল বিভক্ত থাকবে?

তবে এমন দুরূহ উদ্যোগ সফল করতে গেলে কংগ্রেসে বদল প্রয়োজন। আঞ্চলিক নেতাদের প্রত্যাবর্তন তখনই সম্ভব, যখন কংগ্রেস নেতৃত্ব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা দেখাবে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক নেতাদেরও ব্যক্তিগত অহং, পারিবারিক স্বার্থ এবং স্বল্পমেয়াদি লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা রাজনৈতিক পরিচয় ভেঙে কেউই দিল্লির আরেকজন অনুগত সহযোগী হতে চাইবেন না। কিন্তু এও সত্যি, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া রাজনৈতিক ভিত্তিতে ভর করে প্রত্যেক আঞ্চলিক নেতা জাতীয় রাজনীতির ‘কিংমেকার’ হয়ে থাকার স্বপ্নও দেখতে পারেন না। একটি বৃহত্তর কংগ্রেস তোলা সম্ভব, যখন সব পক্ষ ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের খাতিরে বলিদান দিতে সমর্থ হবে। তবেই বিরোধীরা কেবল বিজেপি-বিরোধী শক্তির দুর্বল সমষ্টি না থেকে সুসংহত রাজনৈতিক বিকল্পে পরিণত হবে। এখানেই আসে রাহুল গান্ধীর প্রসঙ্গ।

গত এক দশকে বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদর্শগত সমালোচক হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। অবিরাম রাজনৈতিক আক্রমণের মুখেও স্থিতিশীলতা দেখিয়েছেন এবং বিরোধী রাজনীতিকে একটি তীক্ষ্ণ আদর্শিক ভাষা দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির আদর্শগত মুখপাত্র হওয়াই যথেষ্ট নয়। কংগ্রেসকে কোনও একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। দলটির প্রয়োজন অভিজ্ঞ আঞ্চলিক নেতা, নতুন প্রজন্মের মুখ, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক স্বার্থকে ধারণ করার ক্ষমতা। সর্বোপরি, কংগ্রেসকে আবার সেই ‘বিগ টেন্ট’ বা সর্বগ্রাহী রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হতে হবে, যা একসময় তার পরিচয় ছিল; কোনও সংকীর্ণ ও সঙ্কুচিত রাজনৈতিক গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে।

কংগ্রেসকে আবার সেই ‘বিগ টেন্ট’ বা সর্বগ্রাহী রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হতে হবে, যা একসময় তার পরিচয় ছিল; কোনও সংকীর্ণ ও সঙ্কুচিত রাজনৈতিক গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে।

২০২৪ সালে বিরোধীদের সবচেয়ে বড় ভুল কেবল প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর অভাব নয়। বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য যৌথ নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ বিরোধী শিবির। সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম ‘প্রশ্নচিহ্ন’ হয়ে থেকে গিয়েছেন নীতীশ কুমার। ‘ইন্ডিয়া’ জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি তাঁকে যথাযথভাবে সমন্বয়কের ভূমিকা দেওয়া হত, তাহলে হয়তো ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ ভিন্ন হলেও হতে পারত। কিন্তু কৌশলগত চিন্তার বদলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াই প্রাধান্য পায়।

ইতিহাস খুব কমই দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। ২০২৯ সালের দিকে এগতে এগতে বিরোধীদের সামনে এখন এক মৌলিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন উঠে আসছে– তারা কি পুরনো জোটকে নতুন মোড়কে সাজিয়ে আবারও ভাগ্য পরীক্ষার চেষ্টা করবে? না কি আরও উচ্চাভিলাষী কোনও পথ বেছে নেবে– যেসব শক্তি একসময় একই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভাগ করে নিয়েছিল, তাদের বৃহত্তর পুনর্মিলনের পথ তৈরি করবে? মূল ‘ইন্ডিয়া’ জোট গড়ে উঠেছিল বিজেপিকে রুখতে আগ্রহী আঞ্চলিক দলগুলোর উদ্যোগে। কিন্তু নতুনভাবে পরিকল্পিত একটি কংগ্রেস-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিসর সেই সমীকরণ উল্টে দিতে পারে। সেখানে কংগ্রেস থাকবে কেন্দ্রে, আর শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতারা থাকবেন বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এতে ভোটারদের সামনে একটি অনেক বেশি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে– একদিকে প্রভাবশালী বিজেপি, অন্যদিকে পুনরুজ্জীবিত কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ‘বিকল্প’ শক্তি।

পুনশ্চ: রাজনীতিতে, সিনেমার মতোই, দর্শক সাধারণত একই চিত্রনাট্যের জন্য দ্বিতীয়বার টিকিট কাটে না। ‘ইন্ডিয়া ২.০’ নিঃসন্দেহে একটি সিক্যুয়েল। কিন্তু বিরোধীদের প্রকৃত প্রয়োজন ‘রিবুট অপশন’-এর।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement