সমাজে ধর্মের অস্তিত্বের প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের আধ্যাত্মিক দিকের পৃষ্ঠপোষকতা করে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু বর্তমান সময়ে ধর্মের অস্তিত্ব সম্পর্কিত সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার ভাবনাটিই হারিয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার আবহে। বিভেদ সৃষ্টি করছে মানুষে-মানুষে। এই বিভেদের আগুনে ঘি হিসাবে কাজ করছে সমাজের সেই সমস্ত মাথা, যাদের লাভ সমাজের পতনে। তারা প্রত্যেকেই ধর্মান্ধ। সমস্ত ধর্মেই শান্তি প্রসারের যে সার কথা বলা রয়েছে, সেটি না-বুঝে এরা কেবল সাম্প্রদায়িকতাকেই ধর্মকাজ মনে করে মনুষ্যসমাজের ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। সেজন্যই কবি লিখেছিলেন, 'ধর্মের নামে মোহ এসে যারে ধরে, অন্ধ যে
জন, মারে আর শুধু মরে।'
তারই সাম্প্রতিক নিদর্শন, শতাব্দীপ্রাচীন বদ্রীনাথ এবং কেদারনাথ মন্দিরে কেবলমাত্র হিন্দুরাই প্রবেশ করতে পারবে, এমন নিয়ম চালু হতে চলেছে। অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হতে পারে বদ্রীনাথ-কেদারনাথ মন্দির কমিটি (বিকেটিসি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সবক'টি মন্দিরেই। এই নিয়ম আগে পুরীর মন্দিরে কড়াভাবে কার্যকর ছিল। এর আগে হরিদ্বারে গঙ্গার ঘাটের কাছে একাধিক প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। সেখানেও লেখা ছিল, হর-কি-পৌরি-তে অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষেধ। এগুলি ধর্মীয় স্থান হিসাবে আবেগ জড়িয়ে থাকলেও পাশাপাশি, পর্যটন স্থলও। সেখানে অহিন্দুদের প্রবেশ 'নিষিদ্ধ' করে যে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তা মোটেও কাঙিক্ষত নয়।
যুগ-যুগ ধরে আমাদের দেশ, রাজ্য পারস্পরিক ধর্মবিশ্বাসে শ্রদ্ধা, মিলেমিশে থাকার নিদর্শন তৈরি করেছে
মুখে হিন্দু ধর্ম বললেও আদতে এটি সনাতন ধর্ম, যা উদারতা, সহনশীলতা ও সর্বজনীনতার এক মহান দর্শন, যা 'বসুধৈব কুটুম্বকম' (বিশ্বই পরিবার) মন্ত্রে বিশ্বাসী। এটি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মতবাদে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ঈশ্বরকে বিভিন্ন রূপে ও নামে উপাসনার স্বাধীনতা দেয়, যেখানে সকল পথেই একই পরম সত্তাকে (সচ্চিদানন্দ) লাভ করা যায়। সেখানে ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলে অ-হিন্দুদের বর্জনের মতো পদক্ষেপ আসলে সনাতন ধর্মের আদর্শকেই কলুষিত করছে। পক্ষান্তরে অন্য কিছু ধর্মেও গোঁড়ামি, মৌলবাদের দেখা মেলে। যা সর্বাংশে পরিত্যাজ্য হওয়া উচিত।
মুখে হিন্দু ধর্ম বললেও আদতে এটি সনাতন ধর্ম, যা উদারতা, সহনশীলতা ও সর্বজনীনতার এক মহান দর্শন, যা 'বসুধৈব কুটুম্বকম' (বিশ্বই পরিবার) মন্ত্রে বিশ্বাসী।
যুগ-যুগ ধরে আমাদের দেশ, রাজ্য পারস্পরিক ধর্মবিশ্বাসে শ্রদ্ধা, মিলেমিশে থাকার নিদর্শন তৈরি করেছে। তাই বিভিন্ন মন্দিরে নির্দ্বিধায় পুজো দেয়, মানত করে অন্য ধর্মের মানুষ। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে নানা ধর্মের মানুষের সমাগম হয়। আজমেঢ় শরিফে খাজা মইনুদ্দিন চিস্তি ও দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় চাদর চড়ায় বহু হিন্দু। বড়দিনে গির্জায় শুধু খ্রিস্টানরাই ভিড় জমায় না। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের ভারতে বিবিধের মাঝে মহান মিলনের যে সুর প্রাচীন সময় থেকে চলে আসছে, তা অস্বীকার করে সংখ্যাগুরুর আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার ভাবনা মাথায় আসতে পারে কিছু মূর্খেরই। যারা চোখ থাকতেও দৃষ্টিহীন, পণ্ডিত হয়েও অশিক্ষিত। আশা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সে-পথে হাঁটবে না।
