সাধারণ মানুষের কাছে জিডিপি মানে হয়তো কিছু খটমটে সংখ্যা বা প্রবৃদ্ধির শতাংশ। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোই ঠিক করে দেয় বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কি না, কিংবা আমাদের জীবনযাত্রার মান আসলে বাড়ছে কি না। দীর্ঘ এক দশক পর ভিত্তিবর্ষ বদলানো হল। প্রশ্ন জাগতেই পারে– এই নতুন হিসাবের কী প্রয়োজন? লিখছেন সুজনকুমার দাস।
সম্প্রতি, ভারত সরকার জিডিপি (India GDP) গণনার ভিত্তি বা ‘বেস ইয়ার’ ২০১১-’১২ থেকে পরিবর্তন করে ২০২২-’২৩ নির্ধারণ করেছে। এর ফলে নতুন হিসাবে ২০২৬ সালের এস্টিমেটেড জিডিপি বৃদ্ধির হার পুরনো হিসাবের ৭.৪% থেকে বেড়ে ৭.৬% হয়েছে। নতুন ভিত্তিবর্ষে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় ও স্থায়ী মূলধন গঠন– উভয়ের বৃদ্ধিই ৭ শতাংশের বেশি, যা চাহিদা ও বিনিয়োগের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ মানুষের কাছে জিডিপি মানে হয়তো কিছু খটমটে সংখ্যা বা প্রবৃদ্ধির শতাংশ। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোই ঠিক করে দেয় বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কি না, কিংবা আমাদের জীবনযাত্রার মান আসলে বাড়ছে কি না। দীর্ঘ এক দশক পর ২০১১-’১২ সালের পুরনো চশমা খুলে নতুন চশমা পরল ভারত। প্রশ্ন জাগতেই পারে– এই নতুন হিসাবের প্রয়োজন পড়ল কেন?
আসলে, ভিত্তিবর্ষ বদলানো সময়ের দাবি ছিল। অর্থনীতি একটি জীবন্ত সত্তার মতো, যা প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়। ২০১১ সালে ভারতের বাজারে স্মার্টফোনের রমরমা ছিল না, ফাইভ-জি ইন্টারনেট ছিল কল্পবিজ্ঞানের মতো, আর ঘরে বসে অনলাইনে পণ্য কেনা ছিল বিলাসিতা। গত এক দশকে জিএসটি চালু হয়েছে, ‘ইউপিআই’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টে বিপ্লব এসেছে এবং পরিষেবা খাত বা সার্ভিস সেক্টরের গুরুত্ব আকাশচুম্বী হয়েছে। পুরনো ২০১১-’১২ সালের কাঠামো দিয়ে বর্তমান ডিজিটাল ভারতের অর্থনীতি মাপলে অনেক বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছিল। অনেকটা বড় হয়ে যাওয়া মানুষের ছোটবেলার জামা পরার চেষ্টার মতো। তাই নতুন অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও ধরন বোঝার জন্য ২০২২-’২৩ সালকে ভিত্তিবর্ষ করা একটি বাস্তবসম্মত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
জিডিপি গণনায় স্বচ্ছতা আনতে ভারত এখন আইএমএফ-এর পরামর্শে ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
তবে এই পরিবর্তনের পিছনে কেবল অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন নয়, আন্তর্জাতিক চাপের ভূমিকাও ছিল। ভারতের জিডিপি গণনার পদ্ধতি নিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল’ (IMF) এবং অনেক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসছিলেন। বিশেষ করে ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সংশয় ছিল। আইএমএফ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, ভারত প্রবৃদ্ধি গণনায় যে পদ্ধতি ব্যবহার করত, তাতে তথ্যের অতিরঞ্জন (Over-estimation) হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষ করে যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বা কাঁচামালের দাম কমে যায়, তখন ভারতের জিডিপি
হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যেত, যা আইএমএফ-এর কাছে নির্ভরযোগ্য মনে হত না। তারা সরাসরি সুপারিশ করেছিল যে, ভারতকে ‘জি-২০’ দেশগুলোর মতো ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ পদ্ধতিতে যেতে হবে।
জিডিপি গণনায় স্বচ্ছতা আনতে ভারত এখন আইএমএফ-এর পরামর্শে ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক: ধরুন, একজন আসবাবপত্র বিক্রেতা গত বছর ১০ হাজার টাকার কাঠ কিনে একটি টেবিল তৈরি করে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করলেন। এখানে তাঁর প্রকৃত উৎপাদন বা ভ্যালু অ্যাডিশন হল ৫ হাজার টাকা। পরের বছর কাঠের দাম কমে ৬ হাজার টাকা হল, কিন্তু টেবিলের দাম রাখলেন ১৪ হাজার টাকা। আগের পদ্ধতিতে মনে হত বিক্রেতার উৎপাদন বা লাভ বেড়ে ৮ হাজার টাকা হয়েছে, অথচ বাস্তবে কিন্তু তিনি সেই একটি টেবিলই তৈরি করেছেন। অর্থাৎ, কাঁচামালের দাম কমায় জিডিপির মাপে একটি বড় বিভ্রান্তি তৈরি হত।
নতুন হিসাব অনুযায়ী ২০২৫-’২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৭.৬ শতাংশের কাছাকাছি ধরা হয়েছে।
নতুন পদ্ধতিতে এখন সরকার দু’টি বিষয়ের উপর আলাদাভাবে নজর রাখবে। তৈরি পণ্যের দাম (যেমন: টেবিল) কতটা পরিবর্তন হল। এবং কাঁচামালের দাম (যেমন: কাঠ) কতটা বাড়ল বা কমল। এই দুই দিক থেকেই মুদ্রাস্ফীতি বা দামের ওঠা-নামাকে বাদ দেওয়ার ফলে কাঁচামালের দামের কারণে জিডিপি আর হঠাৎ লাফিয়ে বাড়বে না বা কমবে না। ফলে শিল্পখাতে ঠিক কতটা প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে, তার একটি নিখুঁত ছবি পাওয়া যাবে। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন ভারতের দেওয়া জিডিপি সংখ্যার উপর অনেক বেশি ভরসা করতে পারবেন, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এবার বড় ধরনের আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। আগের সিরিজগুলোতে ভারতের একটি বিশাল অংশ ছিল ‘অসংগঠিত’ খাত, যাদের সঠিক হিসাব পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য কাজ। ফলে সরকারকে অনেকটা অনুমানের আশ্রয় নিতে হত। কিন্তু এখন জিএসটি চালু হওয়ার ফলে ছোট-বড় প্রায় সব ব্যবসার লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড সরকারের হাতে। পাশাপাশি এমসিএ-২১ পোর্টালের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কোম্পানির রিয়েল-টাইম তথ্য এবং ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারের ফলে চা দোকান থেকে শপিং মল– সব জায়গার লেনদেন এখন ট্র্যাক করা সম্ভব। এই বিশাল ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ব্যবহারের ফলে নতুন জিডিপি সিরিজ অনেক বেশি তথ্যনির্ভর হয়েছে এবং আগেকার ‘শেল কোম্পানি’ বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্যের প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী ২০২৫-’২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৭.৬ শতাংশের কাছাকাছি ধরা হয়েছে। অনেকে মনে করতে পারেন পদ্ধতি বদলানোর কারণেই হয়তো প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, ভিত্তিবর্ষ বদলালে সাধারণত অর্থনীতির ‘মোট আকার’ বা ভলিউম বৃদ্ধি পায়, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হারের খুব বড় হেরফের হয় না। এর মানে হল, আমাদের অর্থনীতি রাতারাতি খুব দ্রুতগতির হয়ে যায়নি, বরং আগে যে অংশগুলো আমরা মাপতে পারছিলাম না, এখন সেগুলোকে হিসাবের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এটি অনেকটা এমন যে, আগে আপনি কেবল আপনার বাগানের বড় গাছগুলো গুনতেন, এখন ছোট চারাগাছগুলোও গুনছেন। তাতে বাগানের মোট গাছের সংখ্যা বাড়লেও গাছের বাড়ার গতি একই থাকছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। জিডিপির চমকপ্রদ সংখ্যা আর বাস্তবের সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে অনেক সময় বড় ব্যবধান থাকে।
নতুন পদ্ধতিতে এখন সরকার দু’টি বিষয়ের উপর আলাদাভাবে নজর রাখবে। তৈরি পণ্যের দাম (যেমন: টেবিল) কতটা পরিবর্তন হল। এবং কাঁচামালের দাম (যেমন: কাঠ) কতটা বাড়ল বা কমল।
জিডিপি একটি সামষ্টিক সূচক; এটি বলে দেয় দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু সেই সমৃদ্ধি কার ঘরে পৌঁছচ্ছে, তা বলে না। ভারতে বর্তমানে জিডিপি বাড়লেও বড় উদ্বেগের নাম ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’। আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশনের ফলে উৎপাদন বাড়লেও সেই হারে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। একজন সাধারণ মানুষের কাছে ৭.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও বড় খবর হল– বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কতটা নাগালে আর তার শিক্ষিত সন্তানের জন্য একটা মানসম্মত চাকরি আছে কি না। জিডিপি বাড়লে যদি আয়-বৈষম্য বেড়ে যায়, তবে সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। পরিশেষে বলা যায়, নতুন জিডিপি সিরিজটি ভারতের জন্য একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি আইএমএফের কারিগরি আপত্তিগুলো মিটিয়ে আন্তর্জাতিক আঙিনায় দেশের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। ডাব্ল ডিফ্লেশন এবং ডিজিটাল ডেটা-র ব্যবহার আমাদের অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ করবে।
তবে মনে রাখতে হবে, সংখ্যার ওপারে মানুষের জীবনই আসল। জিডিপি বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়, এটি কেবল একটি মাপার যন্ত্র। যন্ত্র পরিষ্কার হওয়া মানেই এই নয় যে, গন্তব্যে পৌঁছনো সহজ হয়ে গিয়েছে। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে যখন এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল হবে। সংখ্যার জৌলুস বা চশমার স্বচ্ছতা তখনই সার্থক হবে, যখন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের মুখে প্রকৃত তৃপ্তির হাসি থাকবে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক
skdssc76@gmail.com
