যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। নিশ্চিতভাবেই পাইবে 'কন্টেন্ট।' যার একদিকে কোটি কোটি জনতা। কেউ চায় বিনোদন, কেউ শিক্ষা, কারও কাছে নিছক টাইম পাস। ক্যামেরার অপরদিকে কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা। বিভিন্ন পদ্ধতিতে, বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন রূপে তারা শুধু 'ক্রিয়েটার' নন, ইনফ্লুয়েন্সার। সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করতে তাঁরাই এখন নতুন হাতিয়ার। বলা যায়, ভারচুয়াল মিডিয়ায় এক বিরাট ইন্ডাস্ট্রি। কন্টেন্ট ক্রিয়েশন শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, বৃহত্তর 'পেশা'র ক্ষেত্র। চলতি অর্থবর্ষে কন্টেন্ট তৈরির জন্য প্রথাগত শিক্ষার ব্যবস্থা করছে কেন্দ্রীয় সরকার।
রবিবার বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ নির্মলা জানিয়েছেন, দেশের ১৫০০টি সেকেন্ডারি স্কুল ও ৫০০টি কলেজে গড়ে তোলা হবে এবিজিসি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব। অ্যানিমেশন, ভিস্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং, কমিক্স এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এই ল্যাবগুলোয়। এমন নয় যে, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর ডিগ্রি নিয়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বেরোবেন। যাঁরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবে ভিডিও বানাবেন। প্রাথমিক পর্যালোচনায় সেরকম মনে হচ্ছে না। বরং কন্টেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া হবে। তার মধ্যে এডিটিং, ফটোগ্রাফি, এআইয়ের ব্যবহার থাকবে। মূল বিষয় হল, কেবল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন নয়, ভারতীয় জেন জির মধ্যে ডিজিটাল মিডিয়া সংক্রান্ত দক্ষতা বাড়িয়ে তোলা হবে। নির্মলার ঘোষণা, এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
বাজেট ঘোষণা অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের।
এসব তথ্য-পরিসংখ্যানের সঙ্গে ভালো-মন্দ দুই দিকই উঠে আসে। মন্দটা হল, প্রথাগত চাকরির বাজার যে ক্রমশ বন্ধ, তা কি কেন্দ্র সরকার মেনেই নিচ্ছে? যে কারণে নতুন প্রজন্মকে বিকল্প পথের খোঁজ দেওয়া হচ্ছে। আবার এটাও বলা যেতে পারে, এই বিরাট ক্ষেত্রের বিভিন্ন দিক আবিষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে খোদ সরকার। দ্বিতীয়টি অস্বীকারের কোনও উপায় নেই। কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের কার্যকলাপ এখন শুধু ইউটিউবের ১০-১২ মিনিটের ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। লক্ষ-লক্ষ জনতার সঙ্গে তাঁদের নিত্য যোগাযোগ। খাতায়-কলমে ফলোয়ার হিসেবে লেখা থাকলেও আসলে ফ্যান,ভক্ত। সিনেমা বা খেলাধুলোর জগতের তারকাদের জনপ্রিয়তার সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দেন ইনফ্লুয়েন্সরা। পরিস্থিতি এতটাই বদলে গিয়েছে যে, সেই মাধ্যমের লোকজনও এখন 'ক্রিয়েটার' হিসেবে নিজেদের জায়গা বানাতে চাইছেন। জ্ঞান হোক বা বিনোদন- মুঠোভরা দুনিয়ায় সব কিছুই প্রচারযোগ্য। শুধু ঠিকভাবে প্রচার করতে জানতে হয়। সেই কায়দা যে যত ভালো জানবেন, তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা ততটাই সমৃদ্ধ।
যে কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রচারের মুখও হয়ে উঠছেন তাঁরা। ধরা যাক, কেউ শুধু ঘোরার ভ্লগ বানান। বিনো বা খেলার দুনিয়ার বড় মাপের তারকাদের পাওয়ার জন্য গ্যাঁটের কড়িও বেশি লাগে। সেই জায়গায় যদি কোনও জনপ্রিয় ভ্লগারকে ব্যবহার করা যায়, তাতে 'টার্গেট' জনতার কাছে অনায়াসে পৌঁছনো যায়। দেব ও প্রসেনজিতের মতো তারকারাও সিনেমার প্রচারে 'বং গাই'য়ের সঙ্গে 'পথে' নেমেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন বা সম্পর্কে ঢুকে পড়তে তাঁদের জুরি মেলা ভার। তাই ঘরোয়া ব্যবহারের জিনিস বিজ্ঞাপনেরও মুখ ইনফ্লুয়েন্সাররা। কেউ বা শিক্ষামূলক ভিডিও বানান। সামাজিক জীবনে কোনও তর্ক-বিতর্কে এদের দেওয়া তথ্য বা যুক্তিই সম্বল। সবার হাতে মোবাইল, মুহূর্তে ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা। রবিশ কুমারের মতো প্রথিতযশা সাংবাদিকের অস্ত্রও ইউটিউব। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এঁরাই মুখ। ইনফ্লুয়েন্সার নয়, নতুন শব্দই তৈরি হয়ে গিয়েছে 'নিউজফ্লুয়েন্সার'।
এদের প্রভাব কতটা, তার একটা উদাহরণ রাজ শামানির পডকাস্ট। যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজয় মালিয়া। ভারতে আর্থিক প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত প্রাক্তন কিংফিশার কর্তা দিব্যি নিজের 'ইমেজ' ভালো করার জন্য সাক্ষাৎকার দেন। লোকে বিশ্বাস করে, সহানুভূতি জানায়। কোথাও যেন নিজের মধ্যেই একটা সংশয় তৈরি হয়, 'নিশ্চয়ই কিছু সত্যি কথা বলছে।' আবার প্রোপাগান্ডা সিনেমার 'আসল' উদ্দেশ্য জানাতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন অনেকে। সমাধান হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না, তবে বাগবিতণ্ডা চলতেই থাকে। একটার পর একটা ইস্যু। আসে-যায়। মানুষের 'দুর্বল' মস্তিষ্কে থেকে যায় বহুল প্রচারিত কিছু তথ্য। যা ভালো-মন্দ মিশিয়ে তৈরি করেন কনটেন্ট ক্রিয়েটাররা।
রাজ শামানিকে সম্প্রতি আরও একটি ভিডিওয় দেখা গিয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তার প্রচারে রোহিত শর্মার সঙ্গে এই জনপ্রিয় ইউটিউবার। কিংবা পাকিস্তানকে ট্রোল করার জন্য হাজির আরেক পরিচিত মুখ অভিষেক মলহান। অজয় দেবগণের সিনেমায় ক্যামিও হিসেবে থাকেন ক্যারি মিনাটি। ভুবন বাম বা আশিস চাঞ্চলানিরা নিজেরাই সিনেমায় অভিনয় করছেন। বাংলাই বা কম কী? সোশাল মিডিয়ায় সেনসেশন 'লাফটার সেন' বা 'ইয়োর ননসেন'। তারপরও যদি কনটেন্ট ক্রিয়েটারদের আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ইচ্ছা হয়, তাহলে মনে করিয়ে দেওয়া যাক একজন জনপ্রিয় ইউটিউবারের নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কিংবদন্তি ফুটবলারকেও কিন্তু কনটেন্ট ক্রিয়েটারের তালিকায় রাখা যায়। তখন মনে হয়, এ শুধু নিছক বিনোদন নয়। মানুষের কাছে পৌঁছনোর উপায়।
কেন্দ্রীয় সরকার যে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করছে, তা সম্ভবত শুধু জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে নয়। কনসিউমার মার্কেটের পুরো ছবিটা বদলে দিয়েছেন ডিজিটাল ক্রিয়েটাররা। তথ্য বলছে, ক্রিয়েটারদের প্রভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ গ্রাহক কী কিনবেন তার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শুধু শহুরে জেন জি নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও এদের প্রভাব সমানভাবে বিদ্যমান। সরকারেরই অনুমান আগামী সময়ে ব্র্যান্ড কোলাবরেশনের থেকে দেড় থেকে তিনগুণ পর্যন্ত এদেরই প্রাধান্য দেওয়া হবে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের জন্য প্রসার ভারতীর নিজস্ব অনুষ্ঠান রয়েছে 'ক্রিয়েটার'স কর্নার'। খোদ সরকারেরই 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া' প্রকল্পে রিল বানিয়ে টাকা রোজগারের উপায় থাকছে।
কেন্দ্রীয় সরকার যে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করছে, তা সম্ভবত শুধু জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে নয়। কনসিউমার মার্কেটের পুরো ছবিটা বদলে দিয়েছেন ডিজিটাল ক্রিয়েটাররা। তথ্য বলছে, ক্রিয়েটারদের প্রভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ গ্রাহক কী কিনবেন তার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এখানেই শেষ নয়! শুধুমাত্র সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারসদের জন্য বিশেষ পুরস্কারই রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের। যার নাম ন্যাশনাল ক্রিয়েটার অ্যাওয়ার্ড। ২০২৪-এ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত থেকে অনেকে ক্রিয়েটার এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেখান থেকে উঠে আসে এক আশঙ্কার কথা। তখন যাঁরা পুরস্কার পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন 'অভি ও নিয়ু'। জনপ্রিয় ইউটিউবার দম্পতি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও বানান। কিন্তু অভিযোগ, তাতে সরকারি পদক্ষেপকে মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করা হয়। একই অভিযোগ 'আরজে রৌনক' সম্পর্কে। আবার ওই পুরস্কার তালিকাতেই নাম ছিল মৈথিলী ঠাকুরের। বছরের সেরা সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি এই লোকসঙ্গীত গায়িকা বর্তমানে বিহারের বিজেপি বিধায়ক। ২৫ বছর বয়সে তিনি ভারতের সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক।
সরকারি প্রকল্পের জন্য প্রচারের প্রস্তাব প্রতিনিয়ত ডিজিটাল ক্রিয়েটারদের কাছে আসে। অনেকেই সম্মতি জানান। সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আবার ধ্রুব রাঠী বা আকাশ গোস্বামীর মতো প্রতিষ্ঠানবিরোধী স্বরও আছে। সরকারি প্রচারের বিরোধিতায় তাঁরা সরব। ডিজিটাল দুনিয়ায় এই ভারসাম্যের খেলাটাও জরুরি। কিন্তু মুশকিল হয়ে যায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররাই যখন নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে সস্তা প্রচারের জন্য ছোটেন। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পাওয়া রণবীর এলাহাবাদিয়া যখন বাবা-মায়ের যৌনতা নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করেন, তখন তারও ইনফ্লুয়েন্স সমাজে পড়ে। চাপের মুখে রণবীর ভুল স্বীকার করেছিলেন। হাসি-মশকরার ছলে কোনও বিশেষ জাতি, সমাজ, ধর্মকে আঘাত করাও কন্টেন্ট নয়। অথচ তারপরও সময় রায়নার 'জোকস' ভাইরাল হয়। এলভিশ যাদব আবার আরও এককাঠি সরেস। যার মূল 'কন্টেন্ট' হল গালাগালি দেওয়া। সাপের বিষ নিয়ে পার্টি করে বিতর্কে জড়িয়ে ছিলেন। নিজেকে 'হিন্দুবীর' বলে দাবি করা এলভিশকে বিগ বস জেতার পর বিরাট সংবর্ধনা দিয়েছিলেন হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টর। আর সম্প্রতি গোমাংস বিতর্কে কন্টেন্ট ক্রিয়েটার সায়ক চক্রবর্তীর কাণ্ড দেখে একটা কথাই মনে হয়, জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে।
তবে সায়কের ঘটনা আরও একটা জিনিস চোখে আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে, যা রটে তা বিশ্বাসযোগ্য কি না যাচাই করে নেওয়াটা দরকার। উসকানির ফাঁদে পা না দিয়ে কলকাতা যে প্রতিবাদ করেছে, তা প্রশংসাযোগ্য। সায়ক ইচ্ছাকৃত করেছেন বলছি না, তবে সম্ভাবনাকে মূলেই নষ্ট করেছেন বাংলার নেটিজেনরা। 'উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস রেসপন্সিবিলিটি।' যে দুনিয়ায় আঙুলের এক ক্লিকে দাঙ্গা বেঁধে যেতে পারে, সেখানে সবার আগে দরকার নিজের দিকে তাকানো। চার কোণা স্ক্রিনে যা বলছি, তা সত্যিই সৎ উদ্দেশ্যে তো? টাকা ও জনপ্রিয়তার লোভ আছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার হাতছানি আছে। তার বাইরেও আছে এক নতুন জগতকে 'বাসযোগ্য' করে তোলার সুযোগ। কেন্দ্রের নতুন স্কুল-কলেজে তা শেখানো হোক বা না হোক, এই নতুন ভারতে 'ক্রিয়েটার'-এর দায়িত্ব অনেক বেশি।
