গণহেনস্তার মূলে রয়েছে বহু অপরিশোধিত মনের সমবেত খেলা। যে-মন মনে করে, সে অবহেলিত। তত সম্মানের অধিকারী নয়, যত সম্মান পেলে সমাজের উচ্চস্তরের আসন অধিকার করা যায়। প্রতিদিনের পিছিয়ে থাকা, প্রতিদিনের হেরে যাওয়া, প্রতিদিনের বঞ্চনা-পীড়ন ও অসহায়তা শেষত বেরিয়ে আসে অন্যকে গণহেনস্তার পরিবেশে দেখতে পেলে। যার কিছু করার নেই, সেও সেদিন ঐশ্বরিক শক্তিতে যেন বলীয়ান হয়ে ওঠে। ঝাঁকের কইয়ের জীবন যার, সে ঝাঁকের কই হয়েই গণহেনস্তার পালে বাতাস জোগায়। একবারও ভেবে দেখে না, যার প্রতি ধাবিত হচ্ছে গণহেনস্তার বাণ, সেও একজন হেরে যাওয়া মানুষ নয় তো?
প্রতিদিনের যাপনে, প্রতিদিনের ঘষটানিতে সে-ও কোথাও অবদমিত হচ্ছে না তো? এই যে বিস্মরণ, এই যে শ্রেণি-সত্যের আলোসরণি থেকে বিচ্যুতি, গণহেনস্তার পরিসরে এটিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন-রেখাটি এঁকে দেয়। গণহেনস্তা তখন হয়ে ওঠে সহিংস, প্রতিশোধমুখর একটি প্রকল্প। ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে যখন কাউকে 'চোর' বা 'ডাইনি' সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়, একবারও এ প্রশ্ন আগ্রাসী জনগোষ্ঠীর কারও মাথায় প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না- যাকে 'সন্দেহ' করা হচ্ছে-তাকে সন্দেহ করার কারণ কতখানি সত্য। বা, যাকে 'ছেলেধরা' সন্দেহে মেরে ফেলা হল, সে কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেল? বা, যে-ব্যক্তিকে 'বহিরাগত' ভেবে ঠ্যাঙানো হল, সে মানুষটি তাদের মতো সহ-প্রান্তিক বা সমাজের অবহেলিত অংশের মুখ নয় তো? গুজবের ঘূর্ণি কাণ্ডজ্ঞানের বিলোপ ঘটায়। বহু অপরিশোধিত মনের সমবেত জিঘাংসা ও 'গণবিচার' দেওয়ার মানসিকতা- আরও একটি অনুজ্জ্বল, অপ্রসারিত বিষবৃক্ষের বীজ বুনে দেয় 'গণহেনস্তা'-র নামে। চোর সন্দেহে যে মার খায়, তাকে দেখেই আমাদের মধ্যে আগাম ধারণা তৈরি হয়ে যায়, নিশ্চয়ই কোনও অপরাধ সে করেছে।
জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়ার নামান্তর, সমাজের কিনার ঘেঁষে চলা জনগোষ্ঠীর কোনও মহিলা যখন গণহেনস্তার শিকার হয়, তখন জনতা সরাসরি আক্রমণ করে তার নারীত্বকে, আব্রুকে, সতীত্বকে।
বাস্তব থেকে আলগা এই আগাম ধারণাই গণহেনস্তার চালিকাশক্তি। আবার, মহিলাদের যখন গণহেনস্তা করা হয়, তাতে আরও একটি পরত যোগ হয়। তা হল: প্রান্তিকের প্রান্তিকায়ন। পিছিয়ে থাকা অংশের মধ্যে আরও একটি পিছিয়ে থাকা অংশের নির্মাণ ও চিহ্নিতকরণ। 'নারী' মানেই অপবর্গ, বা পুরুষের সঙ্গে সমবর্গের অধিকারহীন একটি মানব প্রজাতি। সাধারণ অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার, তাদেরকে যৌন হেনস্তা করার, বা সংঘ থেকে সরিয়ে ভাবার প্রবণতা রয়েছে। যে-প্রবণতা, পুরুষ-অধিকারের নামান্তর।
এরপরও অসহায়, জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়ার নামান্তর, সমাজের কিনার ঘেঁষে চলা জনগোষ্ঠীর কোনও মহিলা যখন গণহেনস্তার শিকার হয়, তখন জনতা সরাসরি আক্রমণ করে তার নারীত্বকে, আব্রুকে, সতীত্বকে। চুল কেটে নেওয়া, বা বিবস্ত্র করা এরই প্রমাণ। সম্প্রতি নরেন্দ্রপুর এলাকায় একজন মহিলাকে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। কেটে নেওয়া হয়েছে চুল। দোষ: জমিবিবাদ। অর্থাৎ, জমির অধিকার না-পেয়ে নারীকে জব্দ করার অপপ্রয়াসটি এখানে গণহেনস্তার উৎসমুখ। এ উপত্যকায় সভ্যতা নেই।
