তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কাগজে-কলমে শুরু হয়নি, তা আরম্ভ যেন না হয়, সে নিয়ে কূটনৈতিক দৌত্যের সন্ধানে দুনিয়ার প্রধান প্রধান রাষ্ট্রনায়ক যখন ব্যস্ত ও চিন্তিত, সেই সময় সামাজিক মাধ্যমে যেসব ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা যেন বলে দিচ্ছে– তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর আসন্ন নয়, তা কার্যত শুরু হয়ে গিয়েছে! কোনও ভিডিও দেখাচ্ছে ইজরায়েলের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে এমন আশ্চর্য রাসায়নিক, যা মুহূর্তে বিকল করে দেবে সেখানকার ডিফেন্স সিস্টেম।
সত্যজিৎ রায়ের ‘গুগাবাবা’-য় যেমন আমরা দেখেছিলাম, জাদুকর বরফির দেওয়া পুরিয়া বিষের ধোঁয়া সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রজাদের জড়ভরত তুল্য করে দিল, তাদের সাধারণ বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়ার জো হল, তেমনই যেন ইরানের দ্বারা নিক্ষিপ্ত এই মিসাইল করতে চাইছে। কোনও ভিডিও বলছে, ইরানের সামনে ইজরায়েল আর টিকতে পারবে না, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বড়কর্তা এ-কথা বলেছেন। কোনও ভিডিও দেখাচ্ছে– চিন ও রাশিয়ার মধ্যে কথা হয়ে গিয়েছে।
এ দু’টি ‘সুপারপাওয়ার’ এবার একযোগে ট্রাম্পের আমেরিকাকে পালটা দিতে প্রস্তুত। তথ্য থাকছে এসব ভিডিওয়। দেখানো হচ্ছে রকমারি অস্ত্রশস্ত্র। যুদ্ধবিমান থেকে সাবমেরিন। হঠাৎ করে দেখে বোঝা মুশকিল, সত্য না মিথ্যা এসব তথ্য!
সোশাল মিডিয়ায় আমজনতার অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অসত্য, অর্ধপাচ্য, অপরিণত ভিডিও, তাতে স্পষ্ট, এক শ্রেণির মানুষের লক্ষ্য যুদ্ধ ও শান্ত বাস্তবের তফাতকে আরও ঘোলাটে করে দেওয়া।
যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয়– এই ধরনের কথা শিশুতোষক বলে মনে হয়। তাই যদি হত, তাহলে প্রতিরক্ষা খাতে এক-একটি বড় দেশের বিনিয়োগ এত বেশি কেন? যুদ্ধ যদি ঘৃণ্য হয়, তাহলে কেন বড় বড় দেশ সেরা থেকে সেরাতম যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে কালক্ষেপ করছে, গবেষণা চালাচ্ছে? জাতিগত বিদ্বেষ, ধর্মীয় আধিপত্য, সাম্প্রদায়িক হিংসা– সবই প্রকাশের অভিমুখ খুঁজছে খতরনাক অস্ত্রসম্ভারের মধ্য দিয়ে। যুদ্ধের খবরে সাধারণ মানুষ অঁাতকে ওঠে, স্বাভাবিক। কিন্তু যুদ্ধের খবর জানতে, বোমা ফেটে শহর শতচ্ছিন্ন হলে সেই দুর্দশা চাক্ষুষ করতে– খুব কি ক্লান্ত বোধ করে? যুদ্ধে পক্ষ অবলম্বন করা নিয়তি।
এ দু’টি ‘সুপারপাওয়ার’ এবার একযোগে ট্রাম্পের আমেরিকাকে পালটা দিতে প্রস্তুত।
অজান্তে, অবচেতনে আমরা তা করে ফেলি। এবং একবার পক্ষ গ্রহণ করে ফেললে, যুদ্ধে আর নিরপেক্ষতা থাকে না, বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে যুদ্ধের ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলার অবকাশ ও পরিসর নষ্ট হয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের ভিডিও হতে পারে ‘ফেক’, কিন্তু তার চাহিদা তুঙ্গে। এর জন্য দায়ী পক্ষসমৃদ্ধ মতামত।
প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের পদ্ধতিকে আরও নিখুঁত করে তোলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমজনতার অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অসত্য, অর্ধপাচ্য, অপরিণত ভিডিও, তাতে স্পষ্ট, এক শ্রেণির মানুষের লক্ষ্য যুদ্ধ ও শান্ত বাস্তবের তফাতকে আরও ঘোলাটে করে দেওয়া। সাংবাদিক চাইলেই এটা-সেটা লিখতে পারেন না। তঁার কারবার নিখাদ তথ্যর সঙ্গে। যাচাইকরণ ও সাংবাদিকতা অঙ্গাঙ্গি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার সে-দায় নেই। কাজেই সেই সাংবাদিকতা যে প্রশ্নচিহ্নবিদ্ধ, তা আবারও প্রমাণ হয়ে গেল যুদ্ধের এসব ভুয়া ভিডিওয়।
