হিমালয়ের শরীরে যে ক্ষত, যে ভাঙন ধরেছে, তার অভিঘাত হতে পারে আরও ভয়াবহ। উন্নয়নের নামে হিমালয়কে ক্ষত-বিক্ষত করা বন্ধ হোক।
স্বয়ং হিমালয় বিপন্ন। ভিতরে ভিতরে সে অসুস্থ। উপর থেকে তেমন বোঝার উপায় নেই। কিন্তু হিমালয়ের স্বাস্থ্যে ধরেছে নেপথ্য ভাঙন। তার শরীরে দেখা দিচ্ছে দুর্বলতা। ধস নামছে তার অঙ্গে। হিমালয়ের শরীর-স্বাস্থ্যের এই অবস্থা একদিনে হয়নি। বহু বছর ধরে আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে তার ক্রমিক ভঙ্গুরতা, বিপন্নতা, গলন।
৩ বছর আগে, ২০২৩ সালের পুজোর সময়, সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদ ভেঙে যে ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল, তার মধ্যে কি যথেষ্ট পূর্বাভাস ছিল না সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া হিমালয়ের ভাঙন, গলন, প্লাবন, প্রলয়ের? ছিল না কি এই ভবিষ্যৎ বার্তা যে, হিমালয়ের ভাঙন এবং ধসের অপ্রতিহত তাণ্ডব কী অপরিমেয় বিনাশ, ক্ষতি, বেদনার কারণ হতে পারে? তবু আমরা উপেক্ষা করেছি ভূবিজ্ঞানী ও হিমবাহবিদদের সাবধান বাণী এবং সতর্কীকরণ!
মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ে ৪৭টি বিপজ্জনক হ্রদ আছে। এদের মধ্যে ২১টি নেপালে। ২৫টি তিব্বত-নেপাল জুড়ে। এবং ১টি ভারতে। প্রত্যেকটাই হিমবাহ হ্রদ।
অনেকের মনে পড়তে পারে, ২০২০ সালের একটি সমীক্ষা। 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট'-এর সেই সমীক্ষা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, মধ্য এবং পূর্ব হিমালয়ে ৪৭টি বিপজ্জনক হ্রদ আছে। এদের মধ্যে ২১টি নেপালে। ২৫টি তিব্বত-নেপাল জুড়ে। এবং ১টি ভারতে। প্রত্যেকটাই হিমবাহ হ্রদ। অর্থাৎ যে কোনও সময় উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলে জলের চাপ বাড়লে এরা হড়পা বানে ফেটে পড়ে নেমে আসতে পারে অনিবার্য প্রলয়। তিব্বত-নেপাল-ভারত: এই দেশের মাথার উপর প্রতিনিয়ত ঝুলে রয়েছে হিমবাহ হ্রদের বিপর্যয়। অথচ আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছি। এবং আমাদের নানাবিধ বাণিজ্যিক ধান্দা বাড়িয়ে চলেছে হিমালয়ের উষ্ণায়ন। আমরা খেয়াল রাখি না এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের যে, হিমালয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহের গলনের হার প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ে। তখন হিমবাহ গলে হ্রদের জল ক্রমাগত বাড়তে থাকে। যা ঘটেছে নেপালে, ঠিক তা-ই ঘটতে পারে দার্জিলিংয়ে- বলেছেন হিমবাহবিদরা।
পর্যটন বাণিজ্য যেন এই অমোঘ বৈজ্ঞানিক তথ্য মনে রাখে। পর্যটন চাই, কিন্তু হিমালয়ের বিনাশের বিনিময়ে নয়। মনে রাখতে হবে- এক সময় হিমালয় ছিল ভারতের নিভৃত সাধনা ও নিঃসঙ্গ আধ্যাত্মিকতার প্রতীক ও আশ্রয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় আজীবন পলাতক রইলেন হিমালয়ের নিগূঢ় নিঃসঙ্গতায় নিরাকার ঈশ্বরের ঔপনিষদিক উপলব্ধির জন্য। আধুনিক পর্যটন বাণিজ্যের অর্বাচীন লিপ্সা কেড়ে নিয়েছে হিমালয়ের সেই দূরায়ত দূষণমুক্তি। হিমালয়ের উন্নয়ন, গলন, স্খলন ক্রমশ বাড়ছে। মনে রাখবেন, আমাদের মাথার উপর বিপুল বিপজ্জনক গলন্ত হিমবাহর ঝুলন্ত হ্রদের সারি!
হিমালয় আমাদের জল, জীবন, নদী, ঋতু এবং সভ্যতার অন্যতম প্রধান আশ্রয়। তার শরীরে যে-ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তার অভিঘাত পাহাড়ের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না- নেমে আসবে সমতলে, শহরে, জনজীবনে। হিমবাহ গলবে, হ্রদ ফুলবে, ধস নামবে, নদী উন্মত্ত হবে; আর তখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষে কোনও লাভ হবে না। তাই উন্নয়নের নামে হিমালয়কে ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত করার আগে থামতে হবে
